বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তুলার ঐতিহ্য ও সম্ভাবনা: কেন চাষ ছড়াচ্ছে না?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তুলার ঐতিহ্য ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তুলার ঐতিহ্য ও সম্ভাবনা: কেন চাষ ছড়াচ্ছে না?

আসুন প্রথমে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের দিকে তাকাই। আপনি কী পরিধান করছেন? পাঞ্জাবি, লুঙ্গি, শার্ট, প্যান্ট, বা শাড়ি—এই সবকিছুর মূল উপাদান হলো তুলা। শুধু পোশাক নয়, বাড়ির ভেতরে জামাকাপড়, তোয়ালে, বিছানার চাদর, বালিশের কভার, জানালার পর্দা, এমনকি ব্যান্ডেজ ও কটনবাডেও তুলার উপস্থিতি লক্ষণীয়। তুলা কেবল পোশাক তৈরির জন্যই নয়, চিকিৎসা, শিল্প, গৃহস্থালি ও পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরিতেও এর ভূমিকা অপরিসীম।

বাংলাদেশের শিল্পক্ষেত্রে তুলার ব্যবহার: মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশের শিল্পে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত বস্তুগুলোর মধ্যে তুলা শীর্ষস্থান দখল করে আছে। অথচ দেশে তুলার চাষ প্রায় নেই বললেই চলে। এই পরনির্ভরশীলতা আমাদের অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

তুলার ঐতিহাসিক গুরুত্ব

তুলার ইতিহাস মানবসভ্যতার আদিকাল থেকে শুরু। সিন্ধু সভ্যতার চাষিরা প্রথম তুলা থেকে সুতা এবং সুতা থেকে কাপড় তৈরি করেছিলেন। ১৯২৯ সালে মহেঞ্জোদারোর খননে খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৫০ থেকে ২৭৫০ সময়কালের সুতার ছেঁড়া অংশ উদ্ধার হয়েছে। বেদেও তুলা থেকে সুতা ও কাপড় তৈরির প্রশংসা রয়েছে। প্রাচীন গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস উপমহাদেশের মিহি কাপড় বোনার দক্ষতার কথা উল্লেখ করেছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উনিশ শতক পর্যন্ত ভারত, বিশেষ করে বাংলার কারিগরেরা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কাপড় উৎপাদনকারী শিল্প পরিচালনা করেছেন। এখানকার কৃষকেরা খাদ্যশস্যের পাশাপাশি তুলার চাষ করতেন, নিজেরা গাছ লাগাতেন এবং চরকা ও তাঁত ব্যবহার করে কাপড় তৈরি করতেন। লিডসের তুলাবিশেষজ্ঞ এডওয়ার্ড বেইনস বাংলার মসলিনকে ‘অতুলনীয় নিখুঁত’ বলে বর্ণনা করেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তুলা চাষের বর্তমান অবস্থা ও চ্যালেঞ্জ

ধরা যাক পাটের উদাহরণ। পাট চাষে চার মাস লাগে এবং এটি কারখানানির্ভর। কিন্তু তুলা ভিন্ন—তুলায় দাম না পেলেও শ্রম দিয়ে সুতা, তেল ও খইল পাওয়া যায়, যা কাপড় তৈরির ভিত্তি। এই প্রক্রিয়ায় বাংলার কৃষক ও তাঁতিরা স্বাবলম্বী হতে পারেন।

উলিপুরের সাহেবের আলগা থেকে রৌমারী-চিলমারীর চরগুলোয় হাজার হাজার তাঁত চলছে, যেখানে অধিকাংশই গামছা ও গায়ের চাদর বানানো হয়। তবে তারা প্রসেস করা পাট্টা তুলা কিনে আনেন, কারণ স্থানীয়ভাবে তুলার চাষ সীমিত। সময়মতো সুতা না পাওয়া ও কৃত্রিম সংকট এখানে নিয়মিত সমস্যা।

তুলার চাষ ছড়িয়ে পড়ছে না কেন? রংপুর তুলা উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তা জানান, এই বোর্ড কৃষকদের বীজ ও সার সরবরাহ থেকে শুরু করে তুলা কিনে নেওয়ার কাজ করে। তবুও তুলার চাষ ব্যাপকভাবে ছড়াচ্ছে না, প্রধান কারণ হলো খোলাবাজারে তুলাবীজের অভাব এবং উপজেলা পর্যায়ে পরামর্শকেন্দ্রের অনুপস্থিতি। ব্রহ্মপুত্রের চরের কৃষকদের জন্য বিভাগীয় শহর রংপুরে গিয়ে জ্ঞান সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব।

টেকসই অর্থনীতির পথ

গবেষক ওম প্রকাশ তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর বস্ত্র চাহিদা বৃদ্ধি বাংলায় এক লাখ অতিরিক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছিল। এই উৎপাদন বৃদ্ধি কারখানাব্যবস্থা তৈরি করে নয়, বরং অতিরিক্ত জমিতে তুলা চাষ, তাঁত ও দক্ষ কারিগর বৃদ্ধি এবং বিকেন্দ্রীকৃত কাঠামোর মাধ্যমে সম্ভব হয়েছিল। এটি তৎকালীন বাংলাকে পৃথিবীর ধনীতম রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল।

আজকের দিনে, বড় পুঁজি বড় কারখানায় কয়েকজন ব্যক্তিকে সমৃদ্ধ করলেও, চিলমারীর চরের নারীরা যদি বাড়িতে তুলা থেকে সুতা কাটতে ও কাপড় বানাতে পারেন এবং প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে এটি একটি টেকসই অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে। এই প্রক্রিয়া নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা বাড়াবে এবং ঐতিহ্যবাহী ‘চরকা আমার সোয়ামী পুত’ গানের মতো স্মৃতি ফিরিয়ে আনবে।

সর্বোপরি, তুলা চাষ শুধু ঐতিহ্য রক্ষাই নয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। স্থানীয় পর্যায়ে সহায়তা ও পরিকল্পনা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যেতে পারে।