জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধিতে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় মাছ পরিবহন ভাড়া বাড়ছে, বাজারে প্রভাবের আশঙ্কা
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধিতে মাছ পরিবহন ভাড়া বাড়ছে, বাজারে প্রভাবের আশঙ্কা

জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধিতে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় মাছ পরিবহন ভাড়া বাড়ছে

ময়মনসিংহ থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মাছ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে পরিবহন করা হয়। তবে সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সংকটের কারণে এই মাছ পরিবহনের ট্রাকভাড়া আবারও বাড়ছে। এতে মাছের বাজারমূল্যেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির বিস্তারিত

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই নতুন দাম গত রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে, যা সরাসরি পরিবহন খরচকে প্রভাবিত করছে।

ময়মনসিংহের মাছ উৎপাদনের পরিসংখ্যান

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ময়মনসিংহে রেকর্ড ৪ লাখ ১৮ হাজার ৬৪৫ টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে। এটি দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশের সমান। জেলার ৩৩ হাজার ৪৬০ হেক্টর জলমহাল থেকে এই উৎপাদন আসে। প্রতি কেজি মাছ গড়ে ৩০০ টাকা ধরে এর বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। উৎপাদনে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে আছে ভালুকা ও ত্রিশাল উপজেলা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ট্রাকচালকদের প্রতিক্রিয়া ও ভাড়া বৃদ্ধি

আজ সোমবার সকালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশাল উপজেলার কাজীর শিমলা উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে সাতটি ট্রাক সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল, যা মাছ নিয়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও কারওয়ান বাজারের আড়তে যাচ্ছিল। একটি ট্রাকের চালক দুলাল মিয়া জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির আগে যাত্রাবাড়ী বা কারওয়ান বাজারে মাছ নিতে ভাড়া লাগত ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। কিন্তু জ্বালানি নিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর পর থেকে ভাড়া বাড়িয়ে ১১ হাজার টাকা করতে হয়েছে। তিনি দাবি করেন, লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক সময় তেল পাওয়া যায় না এবং গতকাল লিটারপ্রতি ১৫ টাকা দাম বেড়েছে। তাই আরও অন্তত এক হাজার টাকা ভাড়া বাড়াতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ত্রিশালের নুরুর দোকান এলাকার ট্রাকচালক সুমন মিয়া, যিনি প্রায় ১৫ বছর ধরে এই পেশায় আছেন, বলেন, ‘দুপুরের পর মাছ তুলে সন্ধ্যায় ঢাকার দিকে রওনা দিই। আনলোড করে ভোরে আবার ফিরে আসি। কিন্তু তেলের পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অনেক সময় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি দিয়ে তেল নিতে হয়। এখন আবার দামও বেড়েছে। প্রতি ট্রিপে এক থেকে দেড় হাজার টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। আজ আমরা সবাইকে জানিয়ে দিয়েছি, কাল থেকে ভাড়া বাড়িয়ে গাড়ি চালাব।’

মাছ ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ ও সমন্বয় প্রচেষ্টা

ময়মনসিংহ নগরের চুরখাই এলাকার প্রবীণ ট্রাকচালক মো. মোস্তফা বলেন, ময়মনসিংহ থেকে কারওয়ান বাজারে যেতে প্রায় ৭০ লিটার তেল লাগে। নতুন দামে হিসাব করলে প্রতি ট্রিপে এক হাজার টাকার বেশি খরচ বাড়বে, তাই সে অনুযায়ী ভাড়াও বাড়াতে হবে।

ত্রিশালের সাদিক মৎস্য হাউসের মালিক মোশাররফ হোসেন, যিনি ঢাকার কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, রামপুরা, গাবতলী, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায় মাছ বিক্রি করেন, বলেন, ‘গতকালও আমার ৭ ট্রাক মাছ গেছে ঢাকায়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় এখন নতুন করে ভাড়া বাড়ানোর কথা বলছে ট্রাক মালিকেরা। তাঁদের সঙ্গে আজ আমরা বসব। আমরাও যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হই, তাঁরাও যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেভাবে ভাড়া সমন্বয় করা হবে। পরিবহন ভাড়া বাড়ায় মাছের দামও ভোক্তা পর্যায়ে বেড়ে যাবে। আমাদের সমন্বয় করে মাছ কিনতে ও বিক্রি করতে হবে।’

এই পরিস্থিতিতে, মাছের বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের মধ্যে সমন্বয় ও আলোচনা জরুরি হয়ে উঠেছে। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির এই প্রভাব কৃষি ও অর্থনীতির উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।