ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈশাখী শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপন
ঢাবিতে বৈশাখী শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে নববর্ষ উদযাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈশাখী শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মঙ্গলবার বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপিত হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশে। ক্যাম্পাসজুড়ে বৈশাখী শোভাযাত্রা, মেলা, সংগীত, নৃত্য, কবিতা ও বায়োস্কোপ প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে নববর্ষকে স্বাগত জানানো হয়েছে। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষার্থীরা সৃজনশীলতা ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে এই আয়োজনগুলোতে অংশ নিয়ে আনন্দের আবহ সৃষ্টি করেন। পয়লা বৈশাখের এ আনন্দঘন পরিবেশে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ যোগ দেন, যা পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মেলার মতো সাজিয়ে তোলে।

বৈশাখী শোভাযাত্রায় নেতৃত্বে উপাচার্য ও মন্ত্রী

বাংলা নববর্ষ বরণে সকাল ৯টা ৬ মিনিটে চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ প্রতিপাদ্য নিয়ে বৈশাখী শোভাযাত্রা বের হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে এই শোভাযাত্রায় অংশ নেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য, প্রক্টর ও শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন। শোভাযাত্রাটি চারুকলা অনুষদের ৩ নম্বর গেট থেকে শুরু করে শাহবাগ থানার সামনে ঘুরে যায় এবং রাজু ভাস্কর্য, টিএসসি প্রাঙ্গণ, দোয়েল চত্বর ও বাংলা একাডেমির সামনে দিয়ে আবার চারুকলা অনুষদে ফিরে সকাল ১০টা ৫ মিনিটে শেষ হয়। এবারের শোভাযাত্রায় মোরগ, হাতি, পায়রা, দোতারা ও ঘোড়া—এই পাঁচটি প্রধান প্রতীক বা মোটিফ রাখা হয়, যা ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী শোভাযাত্রার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ছাত্রদলের পুতুলনাচ ও নাগরদোলার আয়োজন

বাংলার গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতির উপাদান পুতুলনাচ, নাগরদোলা ও লাঠিখেলার মাধ্যমে বৈশাখ বরণ উৎসব করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা-কর্মীরা। মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়, পরে ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার, শেষ বাংলাদেশ’ দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করা হয়। এরপর ঐতিহ্যবাহী নড়াইলের লাঠিখেলা প্রদর্শিত হয়, যেখানে ঢোলের তালে তালে লাঠি হাতে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে পরাস্ত করার নৃত্য দেখতে মুহূর্তেই আশপাশের মানুষ ভিড় করেন। মল চত্বরে হালখাতার ঘর বসানো হয়, যেখানে পুরোনো আমলের হারিকেনসহ নানা উপাদান দিয়ে সাজানো হয় এবং ছাত্রদলের নেতারা টেবিল দিয়ে হালখাতা পরিচালনা করেন। হাকিম চত্বরে নাগরদোলা বসানো হয়, সকাল থেকেই যেখানে চড়তে মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। অনুষ্ঠানে বাউলগান ও সারিগানের আয়োজন করা হয়, যা বেলা তিনটার দিকে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহসের উদ্বোধন ঘোষণার মাধ্যমে সমাপ্ত হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যুদ্ধবিরোধী গান ও কবিতায় নববর্ষ উদযাপন

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্র, বাংলাদেশ যুব ফ্রন্ট ও কোরাসের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরে যুদ্ধবিরোধী গান ও কবিতার মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে কবি মোহন রায়হান, দীপক সুমন, কবি সোয়েব মাহমুদ, মাভৈ গানের দল, হুমায়ূন আজম রেওয়াজ, ওয়ারদা আশরাফ, গৌরব ভৌমিক ও শিহাব উদ্দিন প্রমুখ গান পরিবেশন ও কবিতা আবৃত্তি করেন। অনুষ্ঠানে ইরান-ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন দেশে চলমান সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। গান-কবিতার আয়োজনের শেষে গ্রামীণ খেলাধুলার আয়োজন করা হয়, যা নববর্ষের উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

জাতীয় ছাত্র শক্তির মেলা ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় উৎসবমুখর পরিবেশে নববর্ষ উদযাপন করে জাতীয় ছাত্র শক্তি। নববর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে মেলা ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করে সংগঠনটি, যেখানে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ জাতীয় ছাত্র শক্তির কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। এই আয়োজনটি নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী মেলার পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করে, যেখানে দর্শনার্থীরা পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ উপভোগ করেন।

ডাকসুর বায়োস্কোপ প্রদর্শনী ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি

বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) কর্তৃক বায়োস্কোপে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসসংবলিত বিভিন্ন ছবি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। মঙ্গলবার ডাকসু ভবনের সামনে সকাল থেকে বায়োস্কোপে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন ছবি প্রদর্শন করা হয়, যা নববর্ষের ঐতিহাসিক দিক তুলে ধরে। নববর্ষকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানুষের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়, তবে বিকেল থেকে এই উপস্থিতি বাড়তে থাকে। মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করার উদ্দেশ্যে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে আসেন দর্শনার্থীরা, যারা উৎসবমুখর পরিবেশে আনন্দে মেতে ওঠেন।

উত্তরা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে বৈশাখী মেলা উপভোগ করতে আসেন সিনথিয়া জাহান নামের এক তরুণী, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজিত মেলা দেখে ছোটবেলার স্মৃতি মনে পড়ার কথা বলেন। তিনি জানান, এবারই প্রথম ঢাকায় নববর্ষ উদযাপন করেছেন। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরে কথা হয় আবদুল জলিল নামের এক রিকশাচালকের সঙ্গে, যিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মেলা দেখতে এসেছেন এবং ছয় বছর বয়সী মেয়ে রাইসা ইসলামের বায়না রাখতেই সবাইকে নিয়ে মেলায় এসেছেন বলে জানান। এই দর্শনার্থীদের উপস্থিতি নববর্ষের উৎসবকে আরও জনপ্রিয় ও স্মরণীয় করে তোলে, যা বাংলা সংস্কৃতির সমৃদ্ধিকে প্রতিফলিত করে।