পার্বত্যাঞ্চলে নববর্ষ উৎসবে মুখর, ঐতিহ্যবাহী 'পাজন' খাবারের মাহাত্ম্য
পার্বত্য নববর্ষ উৎসবে 'পাজন' খাবারের ঐতিহ্য

পার্বত্যাঞ্চলে নববর্ষ উৎসবে মুখরিত পরিবেশ

পার্বত্যাঞ্চলের সর্বত্র এখন উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষায় বর্ণাঢ্য উৎসব উদযাপন করছেন। চাকমাদের বিজু, মারমাদের সাংগ্রাই, ত্রিপুরাদের বৈসুক, তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষু এবং বম ও ম্রো সম্প্রদায়ের চাংক্রান উৎসব পাহাড়জুড়ে রঙিন আবহ তৈরি করেছে। জাতিগত ও ভাষাগত ভিন্নতার কারণে এসব উৎসব ভিন্ন নামে পালিত হলেও এর মূল আবেদন আনন্দ, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির সম্মিলন।

উৎসবের রঙিন আয়োজন

প্রতি বছর এপ্রিল মাস এলেই রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় এই উৎসবের সূচনা হয়। নাচ-গান, আচার-অনুষ্ঠান আর সামাজিক মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে পাহাড়ের মানুষ উৎসবে মেতে ওঠেন। উৎসবকে ঘিরে পাহাড়ে তৈরি হয় নানা ঐতিহ্যবাহী খাবার, যার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও অপরিহার্য হলো ‘পাজন’। এই খাবার ছাড়া পাহাড়িদের উৎসব যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। অতিথি আপ্যায়নের শুরুতেই পাজন পরিবেশন করা হয়, যা তাদের আতিথেয়তার প্রতীক।

পাজন: ঐতিহ্য ও স্বাস্থ্যের মিশেল

পাহাড়ি লোককথা অনুযায়ী, একসময় পাজন রান্নায় প্রায় ১০৭ ধরনের সবজি ব্যবহার করা হতো। তবে বর্তমানে সবজি সহজলভ্য না হওয়ায় ২০ থেকে ৩০ ধরনের সবজি দিয়ে পাজন রান্না করা হয়। এতে কাঁচা কাঁঠাল, সজনে, জুমের আলু, মিষ্টি কুমড়া, শিমফুল, গাজর, শসা, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপিসহ বিভিন্ন পাহাড়ি সবজির মিশ্রণ থাকে। অনেক ক্ষেত্রে শুঁটকি মাছও ব্যবহার করা হয়, যা এর স্বাদকে করে তোলে ভিন্নধর্মী ও সমৃদ্ধ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পাজন রান্নার ইতিহাস কয়েক শ বছরের পুরোনো। ধারণা করা হয়, ‘পাজন’ শব্দটি বাংলা ‘পাঁচন’ শব্দ থেকে এসেছে, যদিও রন্ধনপ্রণালী ও স্বাদে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। পাহাড়িদের বিশ্বাস, পাজন খেলে শরীর ভালো থাকে এবং নানা রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এমনকি একদিনে সাতটি পরিবারের পাজন খেলে সারাবছর সুস্থ থাকা যায়—এমন বিশ্বাসও প্রচলিত রয়েছে, যা এই খাবারকে শুধু খাদ্য নয়, একটি প্রাকৃতিক ওষুধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিমত

শহরের কলেজ গেট এলাকার বাসিন্দা মাসানু রোয়াজা বলেন, “আগে ১০৭ প্রকার সবজি দিয়ে পাজন রান্না করা হতো। এখনও অতিথিদের এই খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়, যা আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ।” একই এলাকার বাসিন্দা পুলিন চাকমা বলেন, “পাজন শুধু খাবার নয়, এটি এক ধরনের প্রাকৃতিক ওষুধ, যা আমাদের স্বাস্থ্য ও ঐতিহ্য রক্ষা করে।” পাহাড়ি সম্প্রদায়ের কাছে পাজন শুধু একটি খাবার নয়, বরং এটি তাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক বন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই উৎসব ও পাজন খাবার পার্বত্যাঞ্চলের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে, যা বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের একটি উজ্জ্বল দিক।