বৈসু উৎসবে ত্রিপুরাদের গরাইয়া নাচে মাতোয়ারা খাগড়াছড়ি
খাগড়াছড়ি শহরের টাউন হল এলাকা থেকে শুরু করে ভাইবোনছড়া, দীঘিনালা, গুইমারা ও খাগড়াপুরের বিভিন্ন পাড়ায় বৈসু উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের নারী ও পুরুষেরা দল বেঁধে ঢোল আর বাঁশির সুরে গরাইয়া নাচ পরিবেশন করছেন, যা দূর থেকেই শোনা যাচ্ছে। গৃহস্থদের বাড়ির উঠানে এই নাচের মাধ্যমে তারা গরাইয়া দেবতাকে তুষ্ট করার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের সুখ-সমৃদ্ধি কামনা করছেন।
বৈসু উৎসব ও গরাইয়া নাচের ঐতিহ্য
ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বর্ষবরণ ও বর্ষবিদায়ের উৎসব বৈসুকে সামনে রেখে গরাইয়া নাচের আয়োজন করা হয়। উৎসব শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই ত্রিপুরা গ্রামগুলোয় এই নাচের ধ্বনি বেজে উঠে। ধীনা ডান্স একাডেমির পরিচালক ধীনা ত্রিপুরা ব্যাখ্যা করেন, ‘গরাইয়া নাচ কেবল বিনোদন নয়, এটি বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার প্রকাশ। নাচের মাধ্যমে গরাইয়া দেবতা তুষ্ট হন এবং তাঁর আশীর্বাদে এলাকার মঙ্গল হয়।’ এই নাচে ২২টি তাল ও মুদ্রা রয়েছে, যা মানবজীবনের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব ক্রিয়াকলাপ প্রদর্শন করে।
পোশাক ও অনুষ্ঠানের বিস্তারিত
গরাইয়া নাচে ত্রিপুরা পুরুষেরা সাদা ধুতি পরিধান করেন, যার সঙ্গে সাদা, নীল বা হলুদ রঙের জামা যুক্ত থাকে। কোমর, মাথা ও হাতে ‘রিসা’ নামক লম্বা ঝুলের কাপড় জড়ানো হয়। নারীরাও তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হন। নাচের দলটি একজন আচাই বা ওঝা এবং একজন দেওয়াই (দল নেতা) দ্বারা পরিচালিত হয়, যাদের ‘খেয়েবাই’ বলা হয়। নাচ শেষে গৃহস্থরা দলকে পানীয়, টাকা, চাল ও ফলমূল দিয়ে আপ্যায়ন করেন।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
গরাইয়া নাচ ত্রিপুরা সমাজে যেকোনো মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের আগে প্রচলিত, এমনকি একসময় যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতিতেও এটি পরিবেশিত হতো। নাচের শেষ দিনে দল সদস্যরা গরাইয়া দেবতার উদ্দেশ্যে পূজা-অর্চনা করেন এবং সবার মঙ্গল কামনা করেন। এই নাচে অংশগ্রহণকারীদের পরপর তিনবার অংশ নেওয়ার নিয়ম রয়েছে, এবং কোনো কারণে অংশ নিতে না পারলে গরাইয়া দেবতার কাছে ক্ষমা চাইতে হয়। খাগড়াছড়ির টাউন হল এলাকা থেকে নাচ করতে আসা দল নেতা অনন্ত ত্রিপুরা বলেন, ‘এই নাচ আমাদের ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের প্রতীক, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বেঁচে আছে।’



