ঈদুল ফিতরে ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহে লাখো মুসল্লির সমাবেশ
ঈদুল ফিতরের পবিত্র দিনে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। এবার এখানে ১৯৯তম ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে ছয় থেকে সাত লাখ মুসল্লি অংশগ্রহণ করেছেন। সকাল ১০টায় বন্দুকের ফাঁকা গুলির মাধ্যমে জামাত শুরু হয় এবং জেলা শহরের বড় বাজার মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ ইমামতি করেন। নামাজ শেষে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও দেশের কল্যাণ কামনা করে দোয়া করা হয়।
প্রবীণ মুসল্লিদের আবেগময় উপস্থিতি
পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে দীর্ঘ ৫৭ বছর ধরে শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজ পড়তে আসছেন ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার কৃষক আলী আকবর আকন্দ (৭২)। তিনি বলেন, "শোলাকিয়া আমার কাছে একটি আবেগের নাম। এই মাঠে নামাজ না পড়লে ঈদের আনন্দ অপূর্ণ থেকে যায়।" ১৪-১৫ বছর বয়স থেকে তিনি চাচার সঙ্গে ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার পথ হেঁটে আসতেন, তবে এখন যাতায়াতব্যবস্থার উন্নতির কারণে হাঁটতে হয় না।
একইভাবে, ৭০ বছর বয়সী ইদ্রিস আলী ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা থেকে এক দিন আগেই শোলাকিয়ায় এসেছেন। তাঁর প্রথম ঈদের নামাজ পড়া হয় পাকিস্তান আমলে, যখন তিনি মাত্র ১৫ বছর বয়সী ছিলেন। তিনি স্মরণ করেন, "বাড়ি থেকে বড়দের সঙ্গে হেঁটে আসতে হতো, অল্প কিছুটা রিকশায়। ২০ টাকা নিয়ে সব খরচ হয়ে যেত।" এবারও তিনি প্রতিবেশী হাতেম আলীকে নিয়ে এসেছেন, যিনি প্রায় ২০ বছর ধরে তাঁর সঙ্গী।
নতুন ও পুরোনো মুসল্লিদের মিলনমেলা
শোলাকিয়া ঈদগাহে প্রতিবছর যেমন প্রবীণ মুসল্লিরা সমবেত হন, তেমনি নতুনদের আগমনও ঘটে। এবার প্রথমবারের মতো ঈদের নামাজ পড়তে এসেছেন নরসিংদীর পলাশের বাছির উদ্দিন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের দুলাল মিয়া, ময়মনসিংহের তারাকান্দার রইছ উদ্দিন, লালচান, জহির উদ্দিন ও মহর উদ্দিন। তাঁরা সবাই এক দিন আগে এসে চর শোলাকিয়া বাগে জান্নাত মসজিদে অবস্থান নিয়েছেন এবং শোলাকিয়ায় নামাজ আদায় করতে পেরে অত্যন্ত খুশি।
বিশাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা
২০১৬ সালের জঙ্গি হামলার স্মৃতি মাথায় রেখে এবার শোলাকিয়া ঈদগাহে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। সেনাবাহিনী, র্যাব, এপিবিএন, আরআরএফ, বিজিবি ও জেলা পুলিশের সদস্যরা মোতায়েন ছিলেন। মাঠের ভেতর ও বাইরে অর্ধশতাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা, ড্রোন ও ছয়টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার স্থাপন করা হয়। মুসল্লিদের নিরাপত্তার জন্য কাউকে ছাতা বা ব্যাগ নিয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, শুধু পাতলা জায়নামাজ অনুমোদিত ছিল। যাতায়াতের সুবিধার্থে দুটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।
ঐতিহাসিক পটভূমি ও বর্তমান পরিস্থিতি
শোলাকিয়া ঈদগাহের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। জনশ্রুতি অনুযায়ী, মোগল আমলে এখানকার পরগনার রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল শ লাখ টাকা, যা থেকে কালের বিবর্তনে শোলাকিয়া নামটি এসেছে। ১৮২৮ সালে সোয়া লাখ মুসল্লি একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করেছিলেন, যা থেকে এটি শোয়ালাকিয়া ঈদগাহ মাঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। "কিশোরগঞ্জের ইতিহাস-ঐতিহ্য" বইয়েও এ বর্ণনা উল্লেখ আছে।
শোলাকিয়া ঈদগাহ কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা বলেন, "এবার লাখ লাখ মুসল্লি উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে নামাজ আদায় করেছেন। দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত এখানেই অনুষ্ঠিত হয়েছে।" জামাতে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম ও কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলামসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নিয়েছেন।
প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম উল্লেখ করেন, "গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাওয়ায় ভয়ের পরিবেশ দূর হয়েছে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এখন আনন্দমুখর পরিবেশে ঈদ উদযাপন করছে।" মুসল্লিরা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে নামাজ শেষে মোনাজাত করে বাড়ি ফিরেছেন, যাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়।



