সিরাজগঞ্জের বারুহাঁসে দেড় শ বছরের ঐতিহ্যবাহী চৌধুরীবাড়ি মসজিদ
সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলার বারুহাঁস গ্রামে দেড় শ বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। চৌধুরীবাড়ি জামে মসজিদ নামে পরিচিত এই স্থাপনাটি মোগল ধাঁচের স্থাপত্যশৈলীর একটি অনন্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়। ভদ্রাবতী নদীর পাড়ে অবস্থিত এই মসজিদটি এলাকার ইতিহাস ও সংস্কৃতির সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মসজিদের ইতিহাস ও নির্মাণ
মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন বারুহাঁসের জমিদার দেলোয়ার হোসেন খান চৌধুরী। তিনি ছিলেন একজন সম্পদশালী জমিদার, যিনি নিজের বাড়ির সামনে এই মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। মসজিদের দক্ষিণ পাশে পারিবারিক কবরস্থান অবস্থিত, যা জমিদার পরিবারের ঐতিহ্যের অংশ। গ্রামের শেষ প্রান্তে ভদ্রাবতী নদীর পাড়ে তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদটি সহজেই দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে।
স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য
মসজিদটিতে তিনটি গম্বুজ ছাড়াও আটটি পিলারের ওপর তিনটি বড় মিনার এবং পাঁচটি ছোট মিনার রয়েছে। কাঠের তৈরি তিনটি দরজা এবং ভেতরের দেয়ালে সুসজ্জিত অলংকরণ মসজিদটিকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। চুন-সুরকির মজবুত গাঁথুনি ও পুরু দেয়াল মোগল আমলের স্থাপত্য কৌশলের প্রতিফলন ঘটায়। মসজিদের ভেতরের কারুকার্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে, যদিও ইমামের জন্য আলাদা মেহরাব ও মিম্বার না থাকায় নামাজের সময় সামনে দাঁড়াতে হয়। প্রতি সারিতে ২০ জন করে তিন সারিতে ৬০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন, এবং বাইরের খোলা বারান্দায় আরও দুই সারির ব্যবস্থা আছে।
পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ
মসজিদটি জমিদার পরিবারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। জমিদার দেলোয়ার হোসেন খান চৌধুরী ইমাম ও মুয়াজ্জিনের বেতন ও অন্যান্য খরচ নির্বাহের জন্য ১০ বিঘা জমি ওয়াক্ফ করে গেছেন। দীর্ঘদিন ধরে মো. খলিলুর রহমান ইমামতি করেছেন, এবং বর্তমানে তাঁর ছেলে আবদুস সবুর এই দায়িত্ব পালন করছেন। ৮০ বছরের আবদুল লতিফ খন্দকার মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যার আগে তাঁর বাবা দৈয়ম আলী খন্দকার এই ভূমিকা পালন করেছেন।
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও গুরুত্ব
স্থানীয় বাসিন্দারা উল্লেখ করেন যে, মসজিদের কারণে এলাকার একটি বিশেষ পরিচিতি গড়ে উঠেছে। অনেক দর্শনার্থী পুরোনো এই মসজিদটি দেখতে আসেন, ছবি তোলেন এবং ভিডিও ধারণ করেন। গবেষক-লেখক খ ম রেজাউল করিমের মতে, এই মসজিদটি মোগল আমলে নির্মিত মসজিদগুলোর স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হিসেবে গৌরবের সঙ্গে টিকে আছে। জমিদার পরিবারের সদস্য বিশাল খান চৌধুরী বলেন, মসজিদের কাঠামো দেড় শ বছর পরও প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে, এবং শুক্রবারে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ নামাজ পড়তে আসেন।
যাতায়াত ও অবস্থান
তাড়াশ সদর থেকে বারুহাঁস গ্রামের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। পাকা সড়ক ধরে অটোভ্যান বা মোটরসাইকেলে গ্রামে প্রবেশ করলে প্রথমে বারুহাঁস বাজার পড়ে। সেখান থেকে ইট বিছানো রাস্তা ধরে পশ্চিম দিকে এগিয়ে ভদ্রাবতী নদীর একটি ঢালাই সেতু পার হলেই জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণে পৌঁছানো যায়। বাড়িতে ঢুকতেই তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই প্রাচীন মসজিদ চোখে পড়ে।
সার্বিকভাবে, বারুহাঁস চৌধুরীবাড়ি মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থানই নয়, বরং বাংলাদেশের স্থাপত্য ঐতিহ্যের একটি মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়, যা আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা জরুরি।



