শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে খাদ্য সংকট: ৯ মাসের বকেয়া বিল ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ২০টি সরকারি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে বকেয়া বিলের অজুহাতে শিশুদের জন্য খাদ্য সরবরাহ বন্ধ হওয়ার সংবাদটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সংকটের পেছনে রয়েছে ৯ মাস ধরে খাবারের বিল পরিশোধ না করা এবং পাঁচ মাস ধরে কর্মীদের বেতন বকেয়া রাখার মতো গুরুতর অব্যবস্থাপনা। এটি রাষ্ট্রীয় একটি সেবামূলক প্রকল্পের চরম ব্যর্থতা ও দায়িত্বহীনতারই প্রতিফলন।
প্রকল্পের মেয়াদ ও চুক্তি নবায়নে জটিলতা
মহিলা ও শিশুবিষয়ক অধিদপ্তরের এই প্রকল্পের আওতায় চার মাস থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকে, যাদের পুষ্টি ও খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। হুট করে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে অভিভাবকদের খাবার পাঠাতে বলা সহজ হলেও, বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। প্রতিটি শিশুর খাবারের ধরন আলাদা হওয়ায়, সেসব খাবার কেন্দ্রে গরম রাখা বা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে খাওয়ানোর বাড়তি চাপ দিবাযত্ন কেন্দ্রের কর্মীদের ওপর পড়বে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, সেখানে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তির নবায়ন কেন ৯ মাস ধরে ঝুলে থাকল? জানা গেছে, পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) সুপারিশ করলেও স্টিয়ারিং কমিটি তা অনুমোদন দেয়নি। এই আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ম্যের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে নিরপরাধ শিশুদের। সোয়া কোটি টাকার বকেয়া বিলের কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
অভিভাবকদের সেবামূল্য ও দায়িত্বহীনতা
অথচ এই শিশুদের বাবা–মায়েরা তাদের আয়ের একটি অংশ নিয়মিত সেবামূল্য হিসেবে পরিশোধ করছেন। তাহলে সেবার মান কেন নিশ্চিত হবে না? এটি একটি গুরুতর প্রশ্ন যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতাকেই তুলে ধরে। দেরিতে হলেও সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে একটি সভা ডাকা হয়েছে, যা ইতিবাচক দিক। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—কেন একটি সংকটের সমাধানের জন্য সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের অপেক্ষা করতে হবে?
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা কি ৯ মাস ধরে এই বকেয়া বিলের খবর জানতেন না? কর্মকর্তারা বেতন বাকি থাকা সত্ত্বেও তাঁরা শিশুদের দেখভালে অবহেলা করেননি, কিন্তু খাবার ছাড়া একটি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র কীভাবে পরিচালিত হতে পারে, তা আমাদের বোধগম্য নয়। এটি প্রকল্পের সার্বিক তদারকি ও ব্যবস্থাপনায় গভীর ফাঁকফোকরেরই ইঙ্গিত দেয়।
ভবিষ্যতের জন্য পদক্ষেপ ও সামাজিক প্রভাব
আমরা আশা করি, বৃহস্পতিবারের সভায় কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুততম সময়ে বকেয়া বিল পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের স্পর্শকাতর প্রকল্পে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি দিবাযত্ন কেন্দ্রগুলো কর্মজীবী নারীদের জন্য একটি বড় ভরসার জায়গা।
সেই ভরসার জায়গায় ফাটল ধরলে তা পরোক্ষভাবে দেশের নারী শ্রমশক্তি ও শিশুদের বিকাশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই, এই সংকটের দ্রুত সমাধান ও প্রকল্পের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।



