শিশু নির্যাতন রোধে নবনির্বাচিত সরকারের জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান
শিশু নির্যাতন রোধে সরকারের জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান

শিশু নির্যাতন: বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

নেলসন ম্যান্ডেলার সেই অমর বাণী স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, ‘শিশুদের সঙ্গে কী আচরণ করা হয়, তা দিয়েই একটা সমাজের আত্মা বোঝা যায়।’ যেকোনো সরকারের সাফল্য মূল্যায়নে তাদের আমলে দেশের শিশুরা কেমন আছে, তা গভীরভাবে বিবেচনা করা অপরিহার্য। বাংলাদেশে নবনির্বাচিত সরকারের সামনে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ নানা দায়িত্ব রয়েছে। তবে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন থেকে শিশুদের সুরক্ষায় তাদের তৎপরতা না বাড়ালে অন্যান্য অর্জনগুলো ম্লান হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

শিশু নির্যাতনের বর্তমান পরিস্থিতি: একটি উদ্বেগজনক চিত্র

জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের ১৯ ধারায় শিশুদের সব ধরনের নির্যাতন থেকে রক্ষা পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত। বাংলাদেশের জাতীয় শিশুনীতি (২০১১) এবং শিশু আইন (২০১৩) অনুসারেও শিশু সুরক্ষার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে শিশুহত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ ও নিষ্ঠুর শাস্তির খবর এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে কিশোরীরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে, যা সমাজের জন্য অশনিসংকেত।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ৪১০ শিশু হত্যা ও ৪৫৬ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তবে প্রচারমাধ্যমে আসা ঘটনাগুলো শুধু ভয়াবহতার অংশমাত্র; অসংখ্য শিশু প্রতিদিন নানা ধরনের যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আড়ালে থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫’–এর প্রাথমিক তথ্য বলছে, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮৬ শতাংশ শিশু জরিপ–পূর্ববর্তী এক মাসের মধ্যে শারীরিক শাস্তির সম্মুখীন হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঝুঁকিপূর্ণ শিশু গ্রুপ ও নির্যাতনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

নির্যাতনের ক্ষেত্রে কর্মজীবী শিশু, পাচার হওয়া শিশু, যৌনকর্মীদের সন্তান, প্রতিবন্ধী শিশু, আদিবাসী শিশু, শরণার্থী শিশু, এইডসে আক্রান্ত শিশু ও দলিত শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন শিশু অধিকারের মারাত্মক লঙ্ঘন, যা তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক বিকাশকে ব্যাহত করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্যাক্ট শিট ‘করপোরাল পানিশমেন্ট অ্যান্ড হেলথ’ (নভেম্বর, ২০২১) শিশু শাস্তির নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরেছে এবং এর অবসানের আহ্বান জানিয়েছে।

গবেষণায় প্রমাণিত, শাস্তির ফলে শিশুদের শারীরিক ক্ষতি, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিবন্ধিতা, ক্যানসার, মাইগ্রেন, হৃদরোগ, আর্থ্রাইটিস ও ওজন বৃদ্ধির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। মানসিকভাবে আচরণগত ও উদ্বেগজনিত ডিজঅর্ডার, বিষণ্নতা, হতাশা, আত্মহত্যার চেষ্টা, মাদকাসক্তি এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি তৈরি হয়। এছাড়া বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, আগ্রাসী আচরণ, অপরাধপ্রবণতা ও পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

শারীরিক বা মানসিক শাস্তি এখন একটি অকার্যকর পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত। মা-বাবা ও শিক্ষকদের দ্বারা শাস্তি পাওয়া শিশুরা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে নির্যাতনকে স্বাভাবিক মনে করে, যা পরবর্তীতে তাদের নিজেদের নির্যাতনকারী বা শিকারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের মধ্যে পোস্টট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার, হতাশা, মাদকাসক্তি, আত্মহত্যার চিন্তা, অন্তরঙ্গ সম্পর্কে সমস্যা ও পেশাগত জীবনে ব্যর্থতা দেখা দিতে পারে।

শিশু নির্যাতনের মূল কারণ ও আইনি দুর্বলতা

বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের বেশির ভাগ ঘটনায় অপরাধীরা শাস্তি থেকে রেহাই পায়, যা এই সমস্যাকে স্থায়ী করে তুলছে। শিশুদের অধস্তন মনে করার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি একটি বড় বাধা। বড়রা প্রায়ই নিজেদের জীবনের জটিলতা থেকে সৃষ্ট হতাশা ও রাগ শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেন, ফলে তারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। তথাকথিত ‘পারিবারিক সম্মান’ রক্ষার নামে পরিবারের সদস্যদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের বিচার প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত করা হয়।

২০১১ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শাস্তি নিষিদ্ধ করতে একটি পরিপত্র জারি করলেও, শিশুরা এখনো শিক্ষকদের মারধর ও অপমানের শিকার হচ্ছে। বাড়ি, প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রেও শিশু শাস্তি চালু রয়েছে। বিশ্বের ৬৯টি দেশ সব ক্ষেত্রে শিশু শাস্তি নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়ন করেছে, কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সেই তালিকায় নেই। আইনের এই বৈষম্যমূলক দিকটি শিশু সুরক্ষাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

শিশু সুরক্ষায় জরুরি করণীয় ও সরকারি ভূমিকা

সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো শিশু সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া, নির্যাতনের মামলাগুলো দ্রুত বিচার আওতায় আনা এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের স্বাস্থ্য, আইনি সহায়তা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন সেবা প্রদান করতে হবে। শিশু আইন, ২০১৩-এর আলোকে কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে জাতীয় পর্যায় থেকে কমিউনিটি পর্যন্ত পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ জরুরি।

নারী ও শিশু, স্বাস্থ্য, সমাজসেবা, শিক্ষা ও আইন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে কাজ করতে হবে, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও গণমাধ্যমে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ১৬.২ (এসডিজি) পূরণে ২০৩০ সালের মধ্যে সব ধরনের শিশু নির্যাতন অবসান অপরিহার্য, যা শাস্তি বিলোপ ছাড়া সম্ভব নয়।

বাড়ি, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র ও সব প্রতিষ্ঠানে শিশু শাস্তি নিষিদ্ধ করে নতুন আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। নীতিমালা, কর্মসূচি ও জনসচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে এই আইন কার্যকর করতে হবে। সুইডেন, ফিনল্যান্ড, জার্মানির মতো দেশে আইন সংস্কারের মাধ্যমে শাস্তি নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয়েছে এবং নির্যাতনের মাত্রা কমেছে।

সামাজিক সচেতনতা ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ

মা-বাবা ও শিক্ষকদের শিশুদের ইতিবাচকভাবে বড় করে তোলার দক্ষতা বাড়াতে হবে, প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে এই বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিশুরা যৌন নির্যাতনের কথা জানালে মনোযোগ দিয়ে শুনে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। গণমাধ্যমের ভূমিকা জোরদার করে শিশু অধিকার-সংক্রান্ত খবর প্রকাশ ও মামলার ফলোআপ করতে হবে, যা জনসচেতনতা ও সরকারি জবাবদিহিতা বাড়াবে।

নির্যাতন-সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে এসডিজি প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে সব শিশুর সুরক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া যায়। শিশুদের নিজেদের সুরক্ষায় সচেতন করতে পাঠ্যপুস্তকে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে। শিশুদের মতামতকে সম্মান করে নির্যাতন অবসান প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ—এই কথাটি স্মরণ রেখে সরকারি নীতিনির্ধারকদের শিশু নির্যাতন অবসানে আন্তরিকতা দেখাতে হবে। শিশুরা বয়সে ছোট ও নির্ভরশীল বলে তাদের সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সব ধরনের শিশু নির্যাতন প্রতিরোধযোগ্য; এর জন্য সদিচ্ছা ও সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। সরকার নেতৃত্ব দিলে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরে শিশু সংবেদনশীলতা গড়ে উঠবে, যা একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণে সহায়ক হবে।