ঝিনাইদাহর ১২ নদী মৃত্যুর প্রান্তে: অবৈধ দখল, দূষণ ও বালু উত্তোলনে বিপন্ন
ঝিনাইদাহ জেলার বারোটি নদী আজ মৃত্যুর প্রান্তে পৌঁছেছে। অবৈধ দখলদারিত্ব, মারাত্মক দূষণ ও নির্বিচারে বালু উত্তোলনের কারণে নদীগুলো তাদের প্রাণ হারাচ্ছে। নবগঙ্গা, চিত্রা, কুমার, ইছামতি, ডাকুয়া ও কপোতাক্ষের মতো প্রধান নদীগুলো ইতিমধ্যেই প্রায় প্রাণহীন হয়ে পড়েছে। এই অবনতি শুধু বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যই নষ্ট করছে না, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় অর্থনীতিকেও হুমকির মুখে ফেলেছে।
নদীগুলোর করুণ দশা: শুকনো খালে পরিণত
জেলার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। একসময়ের পরাক্রমশালী নবগঙ্গা নদী, যা জেলা শহরের হৃদয় দিয়ে প্রবাহিত হতো এবং বড় বড় নৌকা চলাচল করতো, এখন অনেক স্থানে শুকিয়ে গেছে। এমনকি গবাদি পশুও নদী পার হতে পারে। নদীর তলদেশ পলি ও বর্জ্যে ভরে গেছে, বিভিন্ন স্থানে বালুচর দেখা দিয়েছে। প্রভাবশালী স্থানীয়রা এই এলাকাগুলো দখল করে নিয়েছে এবং চাষাবাদসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহার করছে।
১২ নদীর একই পরিণতি
চিত্রা, কুমার, গড়াই, ইছামতি ও কপোতাক্ষসহ মোট বারোটি নদীতে একই পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিছু স্থানে উৎসে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, আবার কোথাও নদীর তীর দখল করা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে নদীর প্রস্থ ও গভীরতা কমিয়ে দিচ্ছে, প্রাকৃতিক পানির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে এবং মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রজাতির আবাসস্থল ধ্বংস করছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য:- খাজুরা এলাকার বাসিন্দা বিরেন হালদার বলেন, "একসময় আমরা এই নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতাম। এখন নদী প্রায় ভরাট হয়ে গেছে—পানি বলতে তেমন কিছুই নেই। যদি জরুরিভাবে ড্রেজিং না করা হয়, নদী সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।"
- আড়াপুরের রহিমা খাতুন বলেন, "আগে এই নদীতে প্রচুর পানি থাকতো। আমরা গোসল ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করতাম। এখন পানির অভাব প্রকট।"
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও প্রশাসনের পদক্ষেপ
ঝিনাইদাহ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, নদীগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য প্রথমে উৎসের অবৈধ বাঁধ অপসারণ করতে হবে। তিনি বলেন, "প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু ড্রেজিং যথেষ্ট নয়—দখলদারিত্ব অপসারণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।"
ঝিনাইদাহের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, নদীগুলো দখলমুক্ত করতে ধাপে ধাপে অভিযান চালানো হবে। তিনি যোগ করেন, "একই সময়ে, প্রাকৃতিক পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধারের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চলছে।"
নদীগুলোর পরিসংখ্যান ও ভবিষ্যৎ হুমকি
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদাহর ছয় উপজেলায় এই বারোটি নদীর মোট আয়তন প্রায় ১,৬৪১.৭৫ হেক্টর। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, যদি তাৎক্ষণিক ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই নদীগুলো শীঘ্রই সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। পরিবেশবিদরা বলছেন, নদী রক্ষায় সমন্বিত ও টেকসই উদ্যোগ এখনই জরুরি হয়ে পড়েছে।



