গত দেড় দশকের বাংলাদেশের রাজনীতির খতিয়ান খুললে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, সংঘাত আর আন্দোলনের চেনা ছবিই ভেসে ওঠে। কিন্তু এই খতিয়ানের উল্টো পিঠে জমা হয়েছে এক নির্মম বাস্তবতার গল্প। গুম, খুন, পঙ্গুত্ব আর রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার হাজারো পরিবারের দীর্ঘশ্বাস। কেউ হারিয়েছেন একমাত্র উপার্জনক্ষম অভিভাবককে, কেউবা কোলের সন্তান। ঠিক এই অন্ধকার সময়ে রাজনীতির চিরাচরিত কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে এক ব্যতিক্রমী মানবিক উদ্যোগের গল্প তৈরি করেছে বিএনপির সামাজিক সহায়তা সেল ‘আমরা বিএনপি পরিবার’।
আত্মপ্রকাশ ও পটভূমি
২০২৪ সালের ২২ মার্চ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমন এবং সদস্য সচিব কৃষিবিদ মোকছেদুল মোমিন মিথুনের নেতৃত্বে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি একটি দলীয় ফোরাম থেকে দেশের অন্যতম আলোচিত সামাজিক প্ল্যাটফর্মে রূপ নিয়েছে।
সংগঠনটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা ২০২৪ সালে হলেও, এর বীজ রোপিত হয়েছিল আরও অনেক আগে। দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সাল থেকেই লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমান ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার পরিবারগুলোর খোঁজ নিতেন। শুরুতে একটি ছোট টিম নীরবে ঈদের খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া, চিকিৎসার খরচ জোগানো বা সন্তানদের পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার কাজগুলো করত। ২০২৩-২৪ সালের দিকে এসে এই নীরব উদ্যোগই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও মানবিক কার্যক্রম
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর সংগঠনটির কার্যক্রম ব্যাপক রূপ নেয়। রাজপথে বুলেটের আঘাতে পঙ্গুত্ববরণ করা তরুণ, দৃষ্টি হারানো শিক্ষার্থী কিংবা সন্তানহারা মায়েদের পাশে দাঁড়ায় এই সেল। শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, এনাম মেডিকেল ও কুর্মিটোলাসহ ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের বেডে বেডে গিয়ে আহতদের জরুরি চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেয় সংগঠনটির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত এই সেল ২৯২টি শহীদ পরিবার ও ২৮৫ জন আহত ব্যক্তির প্রত্যক্ষ পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিয়েছে।
সারাদেশে সহায়তার হাত
‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর মানবিক কার্যক্রমের ভূগোল কেবল রাজধানী বা বড় শহরগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দেশের ৪০টিরও বেশি জেলায় পৌঁছে গেছে তাদের সহায়তার হাত। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সাফজয়ী নারী ফুটবলার ঋতুপর্ণা চাকমার বাড়িতে সংগঠনটির প্রতিনিধি দলের সফর। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও সংগঠনটির প্রধান উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী নিজে পাহাড়ি দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ঋতুপর্ণার অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন।
পাহাড়ের সেই আঙিনায় দাঁড়িয়ে রিজভী আহমেদ বলেছিলেন, “মানবিকতা ছাড়া রাজনীতি পূর্ণতা পায় না। পাহাড়, সমতল, শহর বা গ্রাম—বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষই আমাদের পরিবারের অংশ।”
একইভাবে সেন্টমার্টিন দ্বীপের জেলে পরিবার, মৌলভীবাজারে বিএসএফের গুলিতে নিহত কিশোরী স্বর্ণার পরিবার, কিংবা চট্টগ্রামের বাঁশখালীর প্রান্তিক জনপদ—সবখানেই গেছে ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর সদস্যরা।
টেকসই পুনর্বাসন ও শিক্ষাবৃত্তি
তাৎক্ষণিক নগদ অর্থ সহায়তার চেয়ে সংগঠনটি বেশি জোর দিচ্ছে টেকসই পুনর্বাসনে। নীলফামারীতে শহীদ রব্বানি ও ফেনীতে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার শহীদ হারুনের পরিবারের জন্য নতুন বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। অসহায় পরিবারগুলোকে অটোরিকশা, রিকশা কিংবা নারীদের ক্ষুদ্র ব্যবসার পুঁজি জোগাড় করে দিয়ে স্বাবলম্বী করার চেষ্টা চলছে। গুম-খুনের শিকার পরিবারের প্রায় ১৮০ জনেরও বেশি শিশুকে নিয়মিত মাসিক শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শহীদ জাকির ও হারুনের পরিবারের মেয়েদের বিয়ের দায়িত্বও নিয়েছে সংগঠনটি।
মেধা ও পরিবেশ রক্ষায় উদ্যোগ
রাজনীতি বা চিকিৎসার বাইরে গিয়ে এই সেল তরুণ প্রজন্মের মেধা ও পরিবেশ রক্ষায়ও মনোযোগ দিয়েছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এক তরুণ ড্রোন উদ্ভাবককে সহযোগিতা, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবোটিকস গবেষণায় আর্থিক অনুদান দেওয়া এর অন্যতম উদাহরণ।
শহরের নাগরিক জীবন ও জলজ পরিবেশ রক্ষায় ঢাকা ও বগুড়ার বিভিন্ন পার্ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০০-এর বেশি ডাস্টবিন স্থাপন, লেক পরিষ্কার এবং লেকে মাছের পোনা অবমুক্তকরণের মতো স্বেচ্ছাসেবী কাজ করছে সংগঠনটির কর্মীরা। এমনকি মাইলস্টোন স্কুলের কাছে বিমান দুর্ঘটনা বা করাইল বস্তির অগ্নিকাণ্ডেও প্রথম সারিতে দেখা গেছে এই টিমকে।
নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সংগঠনটির পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন এর আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমন। ফ্যাসিবাদের কঠিন সময়েও সব ধরনের নজরদারি এড়িয়ে তিনি তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। আতিকুর রহমান রুমনের মতে, “রাজনীতি শুধু মিছিল-সমাবেশের নাম নয়। একজন কর্মীর চিকিৎসা বা শহীদ পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেওয়াও রাজনীতির অংশ।”
‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর সদস্য সচিব কৃষিবিদ মোকছেদুল মোমিন মিথুন বলেন, “বিএনপি চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী পরিকল্পনা ও মানবিক নির্দেশনায় আমাদের বিশেষ টিম সারা দেশে কাজ করে যাচ্ছে। এই ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।”
বিএনপি নেতাকর্মীদের মতে, এটি শুধু একটি সাহায্য সংস্থা নয়, বরং এটি বিএনপির জন্য তৃণমূলের সঙ্গে এক ধরনের ‘পারিবারিক ও আত্মিক’ যোগাযোগ পুনর্গঠনের কার্যকর মাধ্যম। চরম বিপদের দিনে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই ধারাবাহিকতা দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।



