রাজশাহীর দরগাডাঙ্গায় প্রাচীন মহুয়া বাগান: মাত্র ১১টি গাছ অবশিষ্ট
রাজশাহীর দরগাডাঙ্গায় প্রাচীন মহুয়া বাগান: ১১টি গাছ

রাজশাহীর দরগাডাঙ্গায় প্রাচীন মহুয়া বাগানের ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা

রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে তানোর উপজেলার কলমা ইউনিয়নের দরগাডাঙ্গা গ্রামে অবস্থিত একটি প্রাচীন মহুয়া বাগান। স্থানীয়ভাবে এটি মোয়া বাগান নামে পরিচিত। একসময় এই বাগানে অসংখ্য মহুয়াগাছ ছিল, কিন্তু বয়সজনিত রোগ ও প্রাকৃতিক কারণে ধীরে ধীরে গাছগুলো মরে যাচ্ছে। বর্তমানে মাত্র ১১টি গাছ অবশিষ্ট রয়েছে, যেগুলোতে এখনও ফুল ফোটে এবং ফল ধরে।

ব্রিটিশ আমলেরও আগের ইতিহাস

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই মহুয়া বাগানের উৎপত্তি ব্রিটিশ শাসনামলেরও আগে। দরগাডাঙ্গা গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি পরমেশ্বর হেমব্রমের ভাষায়, এটি একটি জংলা বাগান, অর্থাৎ প্রাকৃতিকভাবেই গড়ে উঠেছিল। তিনি বলেন, মহুয়াগাছের নিচেই আমার জীবন কেটে গেছে। একসময় তিনি মহুয়া ফুল কুড়িয়ে সেদ্ধ করে রাখতেন, ছোলার সঙ্গে খেতেন, এমনকি বড়া ভেজে মেয়ের বাড়িতে নিয়ে যেতেন। আশপাশের গ্রামের মানুষরাও নিয়মিত ফুল কুড়াতে আসতেন।

চন্দনকোঠা গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম (৬৫) জানান, তাঁর বাবা ১১২ বছর বয়সে মারা গেছেন, তিনিও এই বাগানের উৎপত্তি বলতে পারেননি। এটি প্রমাণ করে যে বাগানটি বহু প্রজন্ম ধরে বিদ্যমান। মোহাম্মদপুর গ্রামের শহিদুল ইসলাম (৫২) যোগ করেন, আগে গাছের সংখ্যা বেশি ছিল এবং ফুলও প্রচুর ফুটত। ফুল দিয়ে পায়েস রান্না করা হতো, যা বাড়িতে সুগন্ধ ছড়িয়ে দিত।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মহুয়া গাছের বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহার

মহুয়া একটি বড় পাতাঝরা বৃক্ষ, যার কাণ্ড দীর্ঘ, মসৃণ ও ধূসর রঙের। বসন্তের মাঝামাঝি সময়ে গাছজুড়ে থোকা থোকা ফুল ফোটে। প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক মোকারম হোসেন তাঁর বাংলাদেশের পুষ্প-বৃক্ষ লতা-গুল্ম বইয়ে উল্লেখ করেছেন, মহুয়াগাছ ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে সহজলভ্য, এবং এর বিপন্নতা যাচাই হয়নি। বৈজ্ঞানিক নাম Madhuca longifolia বা Madhuka indica। স্থানভেদে একে মহুলা, মধুকা, মোহা, মোভা, মহুভা, মাদকম ইত্যাদি নামে ডাকা হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্থানীয়রা মহুয়ার ফুল ও ফল নানাভাবে ব্যবহার করেন। ফুল দিয়ে ক্ষীর-পায়েস রান্না করা হয়, যা অত্যন্ত সুস্বাদু এবং মিষ্টি ঘ্রাণযুক্ত। ফলের তেল দিয়ে পাকোয়ান পিঠা তৈরি করা হয়। পরমেশ্বর হেমব্রমের ভাষায়, মাতকম বাহা হেরেমগিয়া, অর্থাৎ মহুয়া ফুল খুব মিষ্টি।

বর্তমান অবস্থা ও পরিবেশগত গুরুত্ব

দরগাডাঙ্গা বাজার এখন এই মহুয়া বাগানের জায়গায় গড়ে উঠেছে। প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার গাছের নিচে সাপ্তাহিক হাট বসে। সন্ধ্যা হলে বাদুড়ের কিচিরমিচির শোনা যায়, যেগুলো ফল খেতে গাছের ডালে ঢুঁ মারে। তানোরের দর্শনচর্চার সঙ্গে যুক্ত সোহরাব হোসেন (৬৫) দাবি করেন, তিনি সারা দেশে ভ্রমণ করেছেন, কিন্তু এত বেশি মহুয়ার গাছ এক জায়গায় আর কোথাও দেখেননি।

আবদুল আজিজ (৫৫) ও জয়দেব শিকদার (৫৭) এর মতো স্থানীয়রা উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে গাছগুলো দিনে দিনে মরে যাচ্ছে, এবং সংরক্ষণের উদ্যোগ প্রয়োজন। এই প্রাচীন বাগানটি শুধু পরিবেশগত নয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।