ঠাকুরগাঁওয়ে কালিম পাখির আশ্রয়: শামস উদ্দিনের বাড়িতে বাসা বেঁধেছে 'লালু'
ঠাকুরগাঁওয়ে কালিম পাখির আশ্রয়, শামস উদ্দিনের বাড়িতে 'লালু'

ঠাকুরগাঁওয়ে কালিম পাখির আশ্রয়: শামস উদ্দিনের বাড়িতে বাসা বেঁধেছে 'লালু'

ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকৈল উপজেলার ভন্ডগ্রামে একটি কালিম পাখি মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। শনিবার দুপুর ১২টার দিকে, পাখিটি ঘরের চালা থেকে নেমে বাড়ির উঠানে আসে এবং খাবার খুঁজতে শুরু করে। বাড়ির লোকজন পাখিটিকে দেখে কিছু চাল ছুড়ে দেন, যা খেয়ে পাখিটি আবার নিজের নীড়ে ফিরে যায়। এই বাড়িটি ভন্ডগ্রামের মো. শামস উদ্দিনের, যেখানে কালিম পাখিটি এখন স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। পরিবারের সদস্যরা পাখিটিকে স্নেহের সঙ্গে 'লালু' নামে ডাকেন, যা তাদের মধ্যে গড়ে ওঠা গভীর বন্ধনের ইঙ্গিত দেয়।

কালিম পাখির আশ্রয় গ্রহণের গল্প

বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কালিম পাখিটির আশ্রয় গ্রহণের গল্প শুরু হয়েছিল এক ঝড়বৃষ্টির রাতে। ভন্ডগ্রামের ফারুক আহমেদের বাড়ির উঠানে পাখিটি পড়ে যায় এবং উড়তে অক্ষম হয়ে পড়ে। ফারুক ও তাঁর পরিবার পাখিটির সেবা-শুশ্রূষা করেন, এবং সুস্থ হওয়ার পরও পাখিটি তাদের বাড়ি ছেড়ে যায়নি। চার মাস পর, পাখিটি উড়ে গিয়ে শামস উদ্দিনের বাড়িতে চলে আসে এবং সেই থেকে সেখানেই তার বসবাস। ফারুক আহমেদ বলেন, পাখিটি একবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে, উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো হয়। তখনই তিনি জানতে পারেন পাখিটির নাম কালিম। যদিও পাখিটি এখন শামস উদ্দিনের বাড়িতে থাকে, তবুও প্রতিদিন ফারুকের বাড়িতে এসে খাবার খায়।

কালিম পাখির বৈশিষ্ট্য ও বর্তমান অবস্থা

কালিম একটি জলাভূমির পাখি, যা চকচকে নীলচে-বেগুনি রঙের হয়। এদের প্রধান খাদ্য জলজ উদ্ভিদ, গুল্মের কচি পাতা, পদ্মফুলের ভেতরের অংশ, ব্যাঙের বাচ্চা এবং ছোট মাছ। প্রায় ৫০ বছর আগে, সারা বাংলাদেশের বিল-হাওরে এই পাখির দেখা মিলত, কিন্তু বর্তমানে এরা দেশের কয়েকটি হাওরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। শামস উদ্দিনের মতে, পাঁচ মাস ধরে পাখিটি তাঁর বাড়িতে আছে এবং কোথাও উড়ে যায় না। সম্প্রতি পাখিটি নয়টি ডিম পেড়েছে এবং বেশির ভাগ সময় ডিমে তা দিচ্ছে। ডিমের কাছে কেউ এলে পাখিটি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, কিন্তু খাবারের সময় নিচে নেমে আসে এবং খেয়ে আবার ফিরে যায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরিবারের সঙ্গে গভীর বন্ধন

শামস উদ্দিনের স্ত্রী পারুল আকতার পাখিটিকে 'লালু...লালু...লালু...' বলে ডাকলে, পাখিটি ছুটে আসে এবং তাঁর হাতের চাল খায়। পারুল বলেন, 'লালন-পালন করতে গিয়ে পাখিটার প্রতি আমাদের মায়া জমে গেছে। পাখিটাও আমাদের ছেড়ে কোথাও আর যায় না।' এই দৃশ্য পরিবার ও পাখির মধ্যে গড়ে ওঠা অনন্য সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটায়। ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক শিক্ষক মাজেদ জাহাঙ্গীর ব্যাখ্যা করেন, কালিম পাখি দেশীয় জলচর পাখি, যা স্বভাবে বুনো হলেও পোষ মানতে পারে। তিনি বলেন, 'এই পাখিরা প্রকৃতিগতভাবে স্বাধীন থাকতে চায়, কিন্তু যখন তারা কোথাও খাদ্য ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পায়, তখন সেই জায়গার সঙ্গে তাদের বন্ধন তৈরি হয়।' শামস উদ্দিনের বাড়িটি পাখিটির জন্য এমনই একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে।

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের মতামত

রানীশংকৈল উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রুপম চন্দ্র মহন্ত বলেন, প্রাণিকুল সাধারণত যেখানে নিরাপদ মনে করে, সেখানেই আশ্রয় নেয় এবং বাসা বাঁধে। তিনি উল্লেখ করেন, পুরুষ সঙ্গীর সংস্পর্শে না এলেও স্ত্রী কালিম পাখি ডিম পাড়তে পারে, কিন্তু সেসব ডিম থেকে ছানা ফোটে না। এছাড়া, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) এই পাখির প্রজাতিকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত হিসেবে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশের বন্য প্রাণী আইন-২০১২ অনুযায়ী, কালিম পাখি সংরক্ষিত প্রজাতি, তাই লালন-পালন করতে হলে বন বিভাগের অনুমতি নেওয়া উচিত।

এই ঘটনা ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলায় প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠা সুন্দর সহাবস্থানের একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা পরিবেশ সংরক্ষণ ও প্রাণিকুলের প্রতি দায়িত্ববোধের বার্তা বহন করে।