কিশোরগঞ্জের নরসুন্দা নদী: দখল-দূষণে মৃতপ্রায়, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে নতুন সংকট
নরসুন্দা নদী: দখল-দূষণে মৃতপ্রায়, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ

নরসুন্দা নদীর অস্তিত্ব সংকট: দখল, দূষণ ও অবৈধ স্থাপনার চাপে প্রাণহীনতা

একসময় স্রোতস্বিনী, প্রাণচঞ্চল ও নৌচলাচলসমৃদ্ধ নরসুন্দা নদী আজ দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার চাপে মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে। কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া এই নদীটি বর্তমানে গভীর অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। সম্প্রতি পুরান থানা এলাকায় নদীর প্রায় মাঝখানে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ এবং সেখানে ছয়তলা ভবন তৈরির উদ্যোগ এই সংকটকে নতুন ও ভয়াবহ মাত্রা দিয়েছে।

অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও প্রশাসনের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ

কয়েক দিন ধরে নদীর ভেতরে প্রাচীর তোলার কাজ অব্যাহতভাবে চলছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ছবি ছড়িয়ে পড়ার পরই প্রশাসনের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দুই দিনের মধ্যে উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছেন। পৌরসভার পক্ষ থেকেও অনুমোদন স্থগিত ও অবৈধ অংশ অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্মাণশ্রমিকদের দিয়ে প্রাচীর ভাঙার কাজ শুরু হয়েছে।

এই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: নদীর মাঝখানে প্রাচীর ওঠার মতো দুঃসাহসিক কাজ শুরু হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোথায় ছিল? এটি শুধু একটি অবৈধ স্থাপনার প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের নদী ব্যবস্থাপনা, নগর শাসন ও আইনের শাসনের সামগ্রিক ব্যর্থতার প্রতিফলন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইন লঙ্ঘন ও তদারকির শৈথিল্য

বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডের শর্ত অমান্য করে অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে নদীর মাঝবরাবর প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। এটি ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ১৯৯৬, স্থানীয় সরকার আইন ২০০৯, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫, প্রাকৃতিক জলাধার আইন ২০১০ ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এতগুলো আইনের অস্তিত্ব সত্ত্বেও যদি নদীর ভেতরে স্থাপনা গড়ে ওঠে, তবে আইন প্রয়োগের দুর্বলতা ও তদারকির শৈথিল্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নরসুন্দার দীর্ঘস্থায়ী সংকট ও ব্যর্থ প্রকল্প

নরসুন্দা নদীর সংকট নতুন নয়। ২০১২ সালে ১১০ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে নদী পুনঃখনন ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ৩৫ কিলোমিটার এলাকায় কাজ সম্পন্ন হলেও নদী তার নাব্যতা ফিরে পায়নি। অর্থ ব্যয়ের পরও যদি নদীর প্রবাহ ফিরিয়ে আনা না যায়, তবে তা কেবল কারিগরি ব্যর্থতা নয়, জবাবদিহিরও ঘাটতি প্রকাশ করে।

দখলের পাশাপাশি দূষণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। শহরের বিভিন্ন বাজার এলাকা থেকে ময়লা ও পশুর বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এটি শুধু পরিবেশগত ক্ষতি নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও একটি বড় হুমকি।

সমন্বিত উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ রক্ষার আহ্বান

নরসুন্দা নদী কিশোরগঞ্জবাসীর আবেগ ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই নদীকে বাঁচাতে এখন সমন্বিত ও টেকসই উদ্যোগের প্রয়োজন।

  • অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা
  • নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়ন
  • কার্যকর পুনঃখনন ও কচুরিপানা অপসারণ
  • বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি প্রতিষ্ঠা

পাশাপাশি অতীত প্রকল্পগুলোর নিরপেক্ষ নিরীক্ষা করে দায় নির্ধারণ করতে হবে। নরসুন্দাকে বাঁচানো মানে কিশোরগঞ্জ শহরের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। প্রশাসনের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ যেন দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতিতে রূপ না নেয়, সেটিই সবার সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করতে হবে।