বাজেটে মূল্যস্ফীতি না বাড়ানোর আহ্বান, ব্যাংকঋণ কমানো ও পুঁজিবাজার শক্তিশালীকরণের পরামর্শ
আসন্ন জাতীয় বাজেটে এমন কোনও নীতি গ্রহণ না করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা, যা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে কষ্টে ফেলতে পারে। একইসঙ্গে তারা বেসরকারি খাতকে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করতে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাজধানীর একটি হোটেলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই), দৈনিক সমকাল এবং চ্যানেল ২৪ এর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় বক্তারা এসব মতামত তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং সভাপতিত্ব করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ।
সংকোচনমূলক বাজেটের পরামর্শ
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আক্তার হোসেন বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকারকে জনপ্রিয়তাভিত্তিক বাজেট না দিয়ে বরং সতর্ক ও সংকোচনমূলক বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ যত কম হবে, ততই ভালো হবে অর্থনীতির জন্য। এমন বাজেট দেওয়া উচিত নয়, যা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
খেলাপি ঋণ বড় ঝুঁকি
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান শরীফ জহীর ব্যাংক খাতের উচ্চ খেলাপি ঋণকে একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, ভারতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় আড়াই শতাংশ এবং পাকিস্তানে ৬ দশমিক ৯০ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা ৩০ শতাংশের বেশি। শরীফ জহীর আরও জানান, ব্যাংক খাতে প্রায় ৩ শতাংশ মূলধন ঘাটতি রয়েছে। এ পরিস্থিতি কাটাতে মন্দ ঋণ কমানোর জন্য কার্যকর ফ্রেমওয়ার্ক এবং ব্যাংকের পুনঃমূলধনীকরণ জরুরি। না হলে বিদেশি ব্যাংকগুলো ক্রেডিট লাইন কমিয়ে দিচ্ছে, যা ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পুঁজিবাজারভিত্তিক অর্থায়নে জোর
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, সরকারের ব্যাংকঋণ নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়ন বাড়াতে হবে। তিনি প্রস্তাব দেন যে সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠান ও বড় প্রকল্পগুলো পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। এছাড়া তিনি এসএমই খাতকে পুঁজিবাজারে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সব মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব ওয়েবসাইটে প্রকাশের আহ্বান জানান।
করহার কমিয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ
সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি হোসেন খালেদ ব্যাংক খাতের ওপর উচ্চ করের চাপ কমানোর প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, করহার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনতে হবে, যাতে ব্যাংকগুলো মূলধন বাড়াতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশে মোট লেনদেনের মাত্র ৩০ শতাংশ আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে হয়, বাকি ৭০ শতাংশ নগদ বা অনানুষ্ঠানিক। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে লেনদেন ডিজিটাল ও ক্যাশলেস করার ওপর জোর দেন তিনি। একইসঙ্গে শতভাগ অনলাইনে কর পরিশোধের ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানান।
ব্যবসা শুরু, পরিচালনা ও প্রয়োজনে পুনরায় চালু করার প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি অপ্রদর্শিত আয়কে বিনিয়োগে আনতে কার্যকর নীতিমালার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সামগ্রিক প্রস্তাবনা
আলোচনায় বক্তারা একমত হন যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সমন্বিত নীতি গ্রহণ জরুরি। বিশেষ করে:
- ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ কমানো
- পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা
- করহার যৌক্তিক করা
- আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বাড়ানো
এই বিষয়গুলোকে তারা আসন্ন বাজেটের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন, যা অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও সাধারণ মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।



