অর্থনীতি ভঙ্গুর নয়, যথেষ্ট সম্ভাবনাময়
অর্থনীতি ভঙ্গুর নয়, যথেষ্ট সম্ভাবনাময়

একাত্তরে শরণার্থী হয়ে গারো পাহাড়ে গিয়ে উঠেছিলাম। বাবা ছিলেন শিক্ষক। তাঁর এক দেশান্তরী ছাত্রের বাড়িতে শেষতক আশ্রয় পেলাম বারেঙ্গাপাড়ায়। সেখানে আমার ছোটবেলার এক খেলার সাথি ছিল। নাম অর্চনা হাজং। অর্চনা ‘পুতুলের বিয়ে’ খেলার সময় একটি গান গাইত, ‘সি সি পিদাসি/ মাটির কলসি/ ভাঙ্গিলে না লাগে জোড়া, ও অখমি/ ভাঙ্গিলে না লাগে জোড়া।’

ঠিকই তো। ভঙ্গুর জিনিস একবার ভেঙে গেলে আর সেভাবে মেরামত করা যায় না। বাংলাদেশের অর্থনীতিও কি ‘ভঙ্গুর’ পর্যায়ে চলে গেছে? খোদ অর্থমন্ত্রীও বলছেন, তিনি নাকি একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি হাতে পেয়েছেন। অর্থনীতি একটি কাচের গ্লাস নয় যে সেটি ভাঙলে পুরো ব্যবস্থাই অচল হয়ে গেল। শুধু রাজনৈতিক তাড়নায় পুরো অর্থনীতি নিয়ে এহেন প্রচার একদিকে তথ্যনিষ্ঠার পরিচয় দেয় না। অন্যদিকে সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও একটি ভালো বার্তা পৌঁছায় না। অধ্যাপক ইউনূস যখন দেশকে গাজার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, তখন তা বিনিয়োগে মঙ্গল বয়ে আনেনি।

সংস্কারবাদী ও বিপ্লবী শাসকদের কাজ

গত দেড় বছরে তথাকথিত সংস্কারবাদী ও ‘কিঞ্চিৎ বিপ্লবী’ শাসকদের কাজই ছিল আওয়ামী আমলের অর্থনীতি কতটা খারাপ ছিল, তার নিয়মিত বয়ান রচনা করা। সেগুলো ছিল নিজেদের অকর্মণ্যতা ঢাকার চাতুর্যপূর্ণ চেষ্টা। আওয়ামী অর্থনীতি কোভিড-উত্তর সময়কালে দরবেশ যুগে প্রবেশ করেছিল—সে কথা সবারই জানা। সেগুলো নিয়ে পুরোনো গানের মহড়া করার জন্য ছাত্র-জনতা ইউনূস সরকারকে ক্ষমতায় বসায়নি। দিন শেষে তাদের নিজের খাতায় জড়ো হয়েছে ব্যর্থ সংখ্যার মিছিল। মূল্যস্ফীতি কমেনি; বেকারত্ব বেড়েছে, বিনিয়োগ কমেছে ও দারিদ্র্য বেড়েছে। শেয়ারবাজার ও খেলাপি ঋণের অবস্থা হয়েছে আরও শোচনীয়। রিজার্ভ সাড়ে ৯ বিলিয়ন ডলার বাড়লেও সেটি সম্ভব হয়েছে পুঁজি পণ্যের আমদানিতে কষনির কারণে। এর ফলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমে চলে গেছে তিন দশকের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বিএনপির অনেক মন্ত্রী মহোদয় মনে হয় এই তথ্যগুলো সম্বন্ধে অবহিত নন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর বক্তব্য

গত ১৮ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মন্তব্য করেছেন যে বিএনপি অর্থনীতির একেবারে শূন্য অবস্থা থেকে যাত্রা শুরু করেছে। অর্থনীতি তো আর সাইবেরিয়ার তাপমাত্রা মাপার থার্মোমিটার নয় যে মাত্র একটি সংখ্যায় তা বলে দেওয়া যাবে। তিনি বিগত আওয়ামী আমলের অর্থনীতিকে ডোবাতে গিয়ে বিগত ইউনূস সরকারের অগ্নিসভ্যতার অর্থনীতিকে খানিকটা মহান বানিয়ে ফেলেছেন। তিনি বলেছেন যে ‘মাইনাস পয়েন্টে ছিলেন ড. ইউনূস—যিনি মাইনাস থেকে এটিকে শূন্যতে নিয়ে এসেছেন। আমরা সেই শূন্য থেকে শুরু করেছি।’

ইউনূস সরকার অর্থনীতির যে সমূহ ক্ষতি করে গেছে, সেগুলোর তথ্য হাতে থাকার পরও বিএনপির মন্ত্রীরা এগুলো প্রকাশ করতে কোথায় যেন একটা ‘শরম’ অনুভব করেন।

খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক খাত

অর্থমন্ত্রী খেলাপি ঋণ নিয়ে যা বলেছেন তা সত্যি—বিএনপির শেষ বছর এটি শতকরা ১৩ ভাগে উঠলেও এটি বর্তমানে ৩০ ভাগের ওপর। এটি আওয়ামী লীগের সবচেয়ে ব্যর্থ ও কালিমালিপ্ত জায়গা। ক্ষমতা ধরে রাখতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সমর্থন কিনেছিল দলটি। ধনিকগোষ্ঠী তখন লুটের সনদ পেয়ে ব্যাংক খাতকে ফোকলা করে দিয়েছে।

মন্ত্রী মহোদয় একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি একাত্তর থেকে ২০২৬ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতিকে দেখেছেন। কিন্তু এই ৫৬ বছরে অর্থনীতির কোনো উন্নতি তাঁর চোখে পড়েনি। শুধু অধ্যাপক ইউনূসের দেড় বছরের মব–যুগের জাদুস্পর্শে অর্থনীতি নাকি হিমাঙ্ক থেকে শূন্যাঙ্কে এসে উঠেছে—এটিই তাঁর চোখে পড়ল। মন্ত্রী মহোদয় পেশায় একজন আইনজীবীও বটে, যাঁর কথার প্রতিটি শব্দ বস্তুনিষ্ঠ হবে, এমনটিই মানুষ আশা করে থাকে।

অর্থনীতির সূচক ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ

অর্থনীতিবিদ রবার্ট সলো ১৯৮৭ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তাঁর বিখ্যাত প্রবৃদ্ধি মডেলের জন্য, যেখানে তিনি মাথাপিছু আয়কে প্রধান চলক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৫ সালের স্থিরমূল্যে বিএনপি সরকার ২০০১ সালে ৬৪১ ডলারের মাথাপিছু আয় হাতে পায়, যা ২০০৭ সালে ৮২৬ ডলারে উন্নীত হয়। এখানে গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে শতকরা ৩ দশমিক ৭ ভাগ।

২০০৯ সালে আওয়ামী সরকার ৯০২ ডলারের মাথাপিছু আয় হাতে পায়, যা ২০২৪ সালে ১৯৪১ ডলারে উন্নীত হয়। এখানে গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে শতকরা ৪ দশমিক ৯ ভাগ। একই কালপর্বে ভারতের জন্য এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭ ভাগ আর পাকিস্তানের জন্য এটি ছিল মাত্র ১ দশমিক ৬ ভাগ। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল আঞ্চলিকভাবেও সর্বোচ্চ। এটি কি খুব সামান্য অর্জন? এটি কি ভঙ্গুরতা? নাকি অপেক্ষাকৃত অধিক সবলতার প্রমাণ?

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা

গত ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন যে দেশের অর্থনীতি এখন সবকিছুতেই সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি কর-জিডিপি অনুপাত, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, রপ্তানি প্রবৃদ্ধিসহ অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা তুলে ধরেন। তিনি তুলনা করেছেন বিএনপির ২০০৬–এর সঙ্গে ২০২৬ সালের অবস্থার। প্রকারান্তরে দোষ চাপিয়েছেন আওয়ামী সরকারের ওপর। তাঁর তুলনা করা উচিত ছিল ২০০৬–এর সঙ্গে ২০২৪–এর জুলাইয়ের সঙ্গে। তার পরের দেড় বছরে ইউনূস জমানায় অর্থনীতি যতটা ক্ষতিতে পড়েছে, এর আগের আর কোনো কালপর্বে অর্থনীতি এতটা ক্ষতির সম্মুখীন হয়নি।

অর্থমন্ত্রী বলেছেন যে দারিদ্র্যের হার ২০২৪-এ ছিল শতকরা ২০ ভাগ, যা বর্তমান সময়ে প্রায় ৩০ ভাগ। দারিদ্র্য বিমোচনে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ইউনূসের কালপর্বের এই ম্যাজিক, অর্থাৎ মাত্র দেড় বছরে প্রায় ১০ শতাংশ বিন্দুর (পারসেন্টেজ পয়েন্ট) উত্থান সমতুল্য আর কোনো অর্থনীতিতে ঘটেনি। ১৯৯১ বিএনপি যখন ক্ষমতায় আসে, তখন দারিদ্র্যের মাত্রা ছিল শতকরা ৫১ ভাগ, যা এক সুস্থির প্রবণতা রেখায় কমতে কমতে ২০২২ সালে ১৮ দশমিক ৭ ভাগে নামে।

এই সময়ে বিএনপির শাসন ছিল ১০ বছর, আওয়ামী লীগের ১৯ বছর ও এক-এগারোর দুই বছর। দারিদ্র্য দূরীকরণের কৃতিত্ব এই প্রতিটি আমলেরই আনুপাতিকভাবে প্রাপ্য। ইউনূসের আমল পেয়েছে ঋণাত্মক কৃতিত্বের তকমা। গত ৩৬ বছরের ইতিহাসে দারিদ্র্যের এই উল্টোগমন আগে কখনো দেখা তো দূরের কথা, ভাবাও সম্ভব হয়নি।

কর-জিডিপি অনুপাত ও রাজস্ব আদায়

অর্থমন্ত্রী দাবি করেন যে ২০০৬ সালে বিএনপি কর-জিডিপি হার শতকরা ১০ ভাগে তুলে গিয়েছিল। এ দাবিতে ভুল রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের উন্নয়ন নির্দেশক তথ্যভান্ডার অনুযায়ী ২০০৬-এ এটি ছিল শতকরা ৭ ভাগ। এরপর আওয়ামী আমলে এটি বেড়ে সর্বোচ্চ ৯ ভাগে উঠেছিল ২০১২ সালে। এর পর থেকে নামতে নামতে এটি ২০২৪–এ ৭ ভাগের সামান্য ওপরে এসেছে। ইউনূসপর্বে রাজস্ব আদায়ের অক্ষমতা চরম পর্যায়ে ঠেকলে এই হার ৭ ভাগের নিচে পৌঁছায়। তিনি বলেছেন বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে এটি শতকরা ১৫ ভাগে উঠত। অতীত সে কথা বলে না। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত এটি বেড়েছিল অর্ধ শতাংশের কম। দেখা যাক আগামী পাঁচ বছরে মন্ত্রী মহোদয় এটিকে কোথায় নিয়ে যান।

খেলাপি ঋণের বাস্তবতা

অর্থমন্ত্রী খেলাপি ঋণ নিয়ে যা বলেছেন তা সত্যি—বিএনপির শেষ বছর এটি শতকরা ১৩ ভাগে উঠলেও এটি বর্তমানে ৩০ ভাগের ওপর। এটি আওয়ামী লীগের সবচেয়ে ব্যর্থ ও কালিমালিপ্ত জায়গা। ক্ষমতা ধরে রাখতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সমর্থন কিনেছিল দলটি। ধনিকগোষ্ঠী তখন লুটের সনদ পেয়ে ব্যাংক খাতকে ফোকলা করে দিয়েছে। তবে অধ্যাপক ইউনূসের মব জমানায় এটি একক সময়ের বিচারে সবচেয়ে বেশি হারে বেড়েছে। তিন শতাধিক কলকারখানা মব–সন্ত্রাস ও মামলা উৎসবে বন্ধ হওয়ার কারণে এগুলোর মালিকেরা বাধ্য হয়েই ঋণখেলাপি হয়েছেন।

উপসংহার: সম্ভাবনার অর্থনীতি

২০০৬ সালে বিএনপি অর্থনীতিকে যে জায়গায় রেখে গিয়েছিল, তার চেয়ে অনেক উন্নততর স্থানে আজকে তারা এটিকে হাতে পেয়েছে। অবকাঠামো, মাথাপিছু আয়, দারিদ্র্য বিমোচন, বিনিয়োগ, জীবনযাত্রার মান, সামাজিক পুঁজি ও শিল্পায়ন—এই সব সূচকেই বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী সমূহ উন্নতি হয়েছে। দেশ স্বল্পোন্নত অর্থনীতির তকমা থেকে মুক্তি পাওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণে উপস্থিত। অবশ্য পুঁজিবাজার, রাজস্ব ব্যবস্থা ও ব্যাংক খাতে প্রবল দুর্বলতা রয়েছে। কিন্তু বুদ্ধির নীতিবলে এগুলোকে উদ্ধার করা সম্ভব। এ অর্থনীতি অর্চনার গানের কথায় সেই ‘মাটির কলসি’ নয়। এটি ভঙ্গুর নয়। এটি এখনো যথেষ্ট ভালো একটি সম্ভাবনার অর্থনীতি। এই ইতিবাচক বার্তা নিয়েই সরকারের এগিয়ে যাওয়া উচিত।

ড. বিরূপাক্ষ পাল যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট কোর্টল্যান্ড-এ অর্থনীতির অধ্যাপক