বর্তমান সময়ে ফ্যাশন ও আধুনিকতার অংশ হিসেবে অনেকেই শরীরে ট্যাটু বা উল্কি আঁকছেন। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। তবে একজন মুসলিমের জন্য শুধু সৌন্দর্য নয়, ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো কাজের বৈধতা ও প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। তাই অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—শরীরে ট্যাটু থাকলে কি নামাজ হবে? ইসলাম এ বিষয়ে কী নির্দেশনা দিয়েছে? কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিষয়টি জানা জরুরি।
ইসলামে ট্যাটু বা উল্কি আঁকার বিধান
ইসলামে শরীরে ট্যাটু বা উল্কি আঁকা হারাম ও নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ ধরনের কাজ থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। হাদিসে এসেছে—
لَعَنَ اللَّهُ الْوَاشِمَاتِ وَالْمُسْتَوْشِمَاتِ وَالنَّامِصَاتِ وَالْمُتَنَمِّصَاتِ وَالْمُتَفَلِّجَاتِ لِلْحُسْنِ الْمُغَيِّرَاتِ خَلْقَ اللَّهِ
‘আল্লাহ ওইসব নারীকে অভিশাপ দিয়েছেন, যারা উল্কি অঙ্কন করে বা করায়, সৌন্দর্যের জন্য ভ্রু উপড়ে ফেলে এবং দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে; তারা আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন আনে।’ (বুখারি ৪৮৮৬)
ট্যাটু থাকলে কি নামাজ হবে?
যদি ট্যাটু এমনভাবে করা হয়, যা শরীরের চামড়ায় পানি পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে ওজু ও ফরজ গোসল শুদ্ধ হবে না। আর ওজু-গোসল শুদ্ধ না হলে নামাজও সহিহ হবে না। তাই শরীরে এ ধরনের ট্যাটু থাকলে যত দ্রুত সম্ভব তা অপসারণ করার চেষ্টা করতে হবে। তবে যদি ট্যাটু অপসারণ করা অত্যন্ত কঠিন, ব্যয়বহুল বা ক্ষতিকর হয়, তাহলে ব্যক্তি সাধ্য অনুযায়ী তা তুলে ফেলার চেষ্টা করবে এবং একই সঙ্গে ট্যাটু থাকা অবস্থাতেই নামাজ আদায় চালিয়ে যাবে। কারণ কোনো অবস্থাতেই নামাজ ত্যাগ করা যাবে না।
ইসলাম সৌন্দর্যচর্চাকে নিরুৎসাহিত করে না
ইসলাম স্বাভাবিক ও শালীন সৌন্দর্যচর্চাকে অনুমোদন করে। পরিচ্ছন্ন থাকা, সুন্দর পোশাক পরা এবং পরিপাটি জীবনযাপন ইসলামে প্রশংসনীয়। কুরআনের বাণী—
يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
‘হে আদম সন্তান! প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা সৌন্দর্য গ্রহণ করো। খাও ও পান করো, তবে অপব্যয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপব্যয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা আল-আ‘রাফ: আয়াত ৩১)
সৌন্দর্য আর অহংকার এক নয়
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ
এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মানুষ তো চায় তার পোশাক সুন্দর হোক, জুতো সুন্দর হোক—এটাও কি অহংকার?’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ، الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন। অহংকার হলো সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা।’ (মুসলিম ১৪৭)
শরীরে ট্যাটু বা উল্কি অঙ্কন করলে করণীয় কী?
ইসলামে এমন সৌন্দর্যচর্চা নিষিদ্ধ, যা আল্লাহর সৃষ্টি করা স্বাভাবিক অবয়বে স্থায়ী পরিবর্তন আনে। যেমন—দাঁত কেটে সরু করা, ভ্রু তুলে ফেলা, শরীরে উল্কি বা ট্যাটু আঁকা। এসব কাজকে শরিয়তে হারাম বলা হয়েছে। কারণ এগুলো আল্লাহর সৃষ্টিতে অপ্রয়োজনীয় বিকৃতি সৃষ্টি করে।
ইসলাম পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্য ও পরিপাটিকে উৎসাহিত করলেও শরীরের স্বাভাবিক গঠনে স্থায়ী পরিবর্তন এনে সৌন্দর্য বাড়ানোর প্রচেষ্টাকে অনুমোদন করে না। ট্যাটু বা উল্কি তাই ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ। তবে কেউ অজ্ঞতা বা আবেগের বশে অতীতে ট্যাটু করে ফেললে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আন্তরিক তওবা, সংশোধনের চেষ্টা এবং নিয়মিত ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত লাভ করা সম্ভব। কারণ আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।



