বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো ধরনের পেনশন পান না। তাই বেসরকারি খাতের কর্মীদের অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তফসিলি ব্যাংকগুলোর সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের ‘প্রগতি স্কিম’-এ অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ জোরদার করতে নির্দেশ দিয়েছে সরকার। বুধবার (৩ জুন) বাংলাদেশ সচিবালয়ের অর্থ ভবনে আয়োজিত এক পর্যালোচনা সভায় ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) প্রতি এই নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পর্যালোচনা সভায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
বুধবার ঢাকায় সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক পর্যালোচনা বৈঠকে এ কথা উঠে এসেছে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা (এমডি) উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সুরাতুজ্জামান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সহকারী মহাব্যবস্থাপক আয়েশা হক।
২০৩০ সালের লক্ষ্য
অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বৈঠকে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় চার কোটি পরিবারে অন্তত একজন করে সদস্যকে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় আনার লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যাংক খাতকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়। ব্যাংকগুলোর এমডিরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রগতি নামের স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বৈঠকে।
সরকারের নির্দেশনা
এ বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের সব শাখায় সর্বজনীন পেনশন স্কিমের জন্য আলাদা ডেস্ক স্থাপন করতে হবে। এছাড়া ব্যানার প্রদর্শন এবং ব্যাংকের নিজস্ব বিপণন কার্যক্রমে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রগতি স্কিমের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন’ শীর্ষক অংশে বেসরকারি খাতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের বার্ধক্যের সময়ে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেনশন তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
বেসরকারি খাতে পেনশনের অভাব
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান বলেন, দেশে বেসরকারি খাতে কর্মরত প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ নিবন্ধিত শ্রমিক ও কর্মচারীর বড় একটি অংশ অবসর-পরবর্তী কোনো আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় নেই। সরকারি চাকরিজীবীরা সরকারি পেনশন সুবিধা পেলেও বেসরকারি খাতে এমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত। তিনি বলেন, ২০২৩ সালে চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার অধীনে প্রগতি স্কিম বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য একটি কার্যকর ও টেকসই অবসর সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে।
প্রস্তাবনা ও আলোচনা
সভায় প্রগতি স্কিমকে আরও আকর্ষণীয় করতে শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালু, নমিনিদের জন্য আজীবন পেনশন সুবিধা বিবেচনা এবং আউটসোর্সিং কর্মীদের অন্তর্ভুক্তির মতো প্রস্তাবনাগুলোও তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোয় পেনশন আছে জানিয়ে মো. সুরাতুজ্জামান বলেন, যেসব ব্যাংকে নেই, সেগুলোর কর্মীরা প্রগতি স্কিমে এলে অবসরজীবনে তারা পেনশন ভোগ করতে পারবেন। বেসরকারি ব্যাংকের কী পরিমাণ কর্মী রয়েছেন-এ বিষয়ে সুরাতুজ্জামান জানান, তিনি জানতে পেরেছেন, এ সংখ্যা এক লাখের বেশি।
প্রগতি স্কিমের বৈশিষ্ট্য
প্রগতি স্কিমের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে বলা হয়, এটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মীদের জন্য বিশেষভাবে প্রণীত। কোনো প্রতিষ্ঠান স্কিমে যুক্ত হলে মাসিক চাঁদার ৫০ শতাংশ কর্মী এবং বাকি ৫০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বহন করবে। মাসিক চাঁদার পরিমাণ ১ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। অংশগ্রহণকারীরা অবসরের পর আজীবন মাসিক পেনশন সুবিধা পাবেন। এছাড়া চাঁদার ওপর আয়কর রেয়াত রয়েছে। পেনশনও আয়করমুক্ত থাকবে। ৬০ বছর পূর্তির পর সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ এককালীন গ্র্যাচুইটি হিসেবে তোলার সুযোগও থাকবে। বিনিয়োগে রয়েছে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি।
সর্বজনীন পেনশনের অগ্রগতি
সর্বজনীন পেনশন স্কিমের অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরে জানানো হয়, গত ৩০ মে পর্যন্ত প্রগতি, প্রবাস, সুরক্ষা, সমতা-এই চার স্কিমে মোট নিবন্ধিত সদস্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৯৩০ জন। জমার পরিমাণ প্রায় ২৬০ কোটি টাকা, যা এখন মুনাফাসহ দাঁড়িয়েছে ২৮৬ কোটি টাকা। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ৪৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে। এর মধ্যে ২৪টি ব্যাংক সক্রিয়ভাবে পেনশন স্কিমের চাঁদা নেওয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।



