বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে একক নির্ভরতা কমিয়ে সব ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের জন্য সেবা উন্মুক্ত করার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সুপারিশ করে।
একক গেটওয়েতে ঝুঁকি
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জারি করা ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিসংক্রান্ত নীতিমালা’-তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন, ফি, বিভিন্ন চার্জ ও অনুদানসহ সব ধরনের আয় সোনালী ব্যাংকের সোনালী পেমেন্ট গেটওয়ে (এসপিজি) অথবা সরকারি মালিকানাধীন অন্য কোনও ব্যাংকের গেটওয়ের মাধ্যমে গ্রহণের বিধান অন্তর্ভুক্ত করে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, বিপুলসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন এককভাবে একটি গেটওয়ের মাধ্যমে পরিচালনা করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উল্লেখ করেছে, দেশের হাজারো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফি ও অন্যান্য মাশুল আদায়ের চাপ এককভাবে সোনালী পেমেন্ট গেটওয়ের ওপর পড়লে সেবার মান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি কোনও ধরনের কারিগরি ত্রুটি বা সিস্টেম বিপর্যয় দেখা দিলে পুরো আদায় কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়তে পারে, যা শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান— সবার জন্যই ভোগান্তির কারণ হবে।
উন্মুক্ত ব্যবস্থার প্রস্তাব
এই কারণে মাশুল আদায়ের ব্যবস্থা শুধু একটি পেমেন্ট গেটওয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত সব পেমেন্ট গেটওয়ের জন্য উন্মুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাদের মতে, এই ধরনের উন্মুক্ত ব্যবস্থা চালু হলে একক আধিপত্য কমবে, প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং ব্যবহারকারীরা আরও উন্নত ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বর্তমানে দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ১০টি পেমেন্ট সিস্টেমস অপারেটর কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর পেমেন্ট গেটওয়ে সেবা দিচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকের ‘এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ সরকারি গেটওয়ের তুলনায় অধিক উন্নত, ব্যবহারবান্ধব এবং প্রযুক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ।
সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের ফি পরিশোধের ক্ষেত্রে বিকল্প পেমেন্ট চ্যানেল চালু করা হলে তারা নিজেদের সুবিধামতো ব্যাংক, ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ে বা এমএফএসের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন। এতে অভিভাবকদের ভোগান্তি কমবে এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবার ব্যবহার বাড়বে।
ইলেকট্রনিক লেনদেনের গুরুত্ব
এছাড়া বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রচলিত ক্রস চেকের পরিবর্তে ইন্টারনেট ব্যাংকিং ফান্ড ট্রান্সফার এবং ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে লেনদেন আরও দ্রুত, নিরাপদ ও স্বচ্ছ হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
নীতিমালার পটভূমি
উল্লেখ্য, গত ৬ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিসংক্রান্ত নীতিমালা’ জারি করে। নীতিমালার ৫(ক) অনুচ্ছেদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব ধরনের আয় নির্ধারিত ব্যাংক হিসাব অথবা সোনালী পেমেন্ট গেটওয়ে কিংবা সরকারি মালিকানাধীন অন্য কোনো ব্যাংকের গেটওয়ের মাধ্যমে গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়। এখন ওই বিধান সংশোধন করে সব লাইসেন্সপ্রাপ্ত পেমেন্ট গেটওয়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও বাড়বে। একই সঙ্গে বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে, সেবার মান উন্নত হবে এবং লেনদেনের ব্যয়ও কমে আসবে। ফলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান— সব পক্ষই এর সুফল ভোগ করবে।



