দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সংস্কারকে শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, ব্যাংকিং, রাজস্ব, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়।
পিআরআই সেমিনারে মতামত
বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) আয়োজিত এক সেমিনারে এসব মতামত উঠে আসে। অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা আসন্ন বাজেট, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা করেন।
ফাহমিদা খাতুনের বক্তব্য
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “সংস্কার যেন কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ না থাকে। অতীতে অ-রাজনৈতিক সরকারের সময়েও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে বড় ধরনের সাফল্য আসেনি।”
তিনি বলেন, “ব্যাংকিং, জ্বালানি ও অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত যেন কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ‘মাফিয়া তন্ত্রের’ প্রভাবে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।” একইসঙ্গে তিনি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি ও পরিচালন ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধিকে আর্থিক শৃঙ্খলার জন্য উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন।
ফাহমিদা খাতুন জানান, চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে সময় ও ব্যয়—দুইই বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেবল সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর না করে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করারও পরামর্শ দেন তিনি।
জাইদি সাত্তারের মন্তব্য
সেমিনারে পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার বলেন, “বাংলাদেশের বর্তমান শুল্ক কাঠামো অত্যন্ত অযৌক্তিক পর্যায়ে রয়েছে।” তার ভাষায়, “গড় শুল্ক প্রায় ৫৫ শতাংশ। এই উচ্চ শুল্ক হার বহাল রেখে কোনও দেশের সঙ্গে কার্যকর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করা সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ গত দুই দশক ধরে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কথা বললেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনও চুক্তি করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য কম থাকার অন্যতম কারণ উন্মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থা হলেও বাংলাদেশ এখনো সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।”
আশিকুর রহমানের মূল প্রবন্ধ
সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআই-এর প্রিন্সিপাল ইকোনমিস্ট ড. আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, “কেবল সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি বা বাজারে চাহিদা বাড়িয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন উৎপাদনশীলতা-ভিত্তিক নতুন প্রবৃদ্ধি মডেল।”
তার মতে, নতুন গ্রোথ মডেলের ভিত্তি হতে হবে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, জ্বালানি সংকট নিরসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর সংস্কার।
নাসিরুদ্দিন আহমেদের রাজস্ব সংস্কার প্রস্তাব
রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান ড. নাসিরুদ্দিন আহমেদ বলেন, কর নীতি প্রণয়ন ও কর আদায়ের দায়িত্ব একই প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়। তাই কর নীতি ও কর প্রশাসনকে আলাদা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি ভারতের উদাহরণ টেনে ক্ষুদ্র সেবা প্রদানকারী ও বাইক রাইডারদের জন্য সহজ কর ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি করদাতাদের হয়রানি বন্ধের আহ্বান জানান।
শামস মাহমুদের বক্তব্য
বেসরকারি খাতের সংকট তুলে ধরে ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, “গত এক দশকে গুটিকয়েক প্রভাবশালী গোষ্ঠী ব্যাংকিং খাত নিয়ন্ত্রণ করেছে। তারা স্বল্প সুদে ঋণ নিয়ে অর্থ পাচার করলেও সাধারণ উদ্যোক্তারা এখন উচ্চ সুদের চাপে ব্যবসা পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছেন।”
তিনি এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানান।
সেমিনারের উপসংহার
সেমিনারে বক্তারা বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক সংস্কার ও কার্যকর বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।



