শিশুশিল্পীর বাগ্দান ও বাল্যবিবাহের নির্মম বাস্তবতা: আইন কি যথেষ্ট?
শিশুশিল্পীর বাগ্দান ও বাল্যবিবাহের নির্মম বাস্তবতা

শিশুশিল্পীর বাগ্দান ও বাল্যবিবাহের নির্মম বাস্তবতা: আইন কি যথেষ্ট?

মাত্র ১৫ বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে পরিচিত এক কিশোরী নিজের বাগ্দানের ঘোষণা দিয়েছে। যদিও তিনি জানিয়েছেন, আইন মেনে ১৮ বছর পূর্ণ হলে তিন বছর পর বিয়ে হবে, তবুও এই ঘটনা বাল্যবিবাহের প্রসঙ্গটি নতুন করে আলোচনায় এনেছে। বাংলাদেশে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর হলেও, এই শিশুশিল্পীর সর্বশেষ বক্তব্যেও আলোচনা থামেনি। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এই কিশোরী যে উদাহরণ তৈরি করলেন, তার সামাজিক প্রভাব ও ক্ষতি কি তার পরিবার বিবেচনা করেছে?

সাতক্ষীরার গ্রামে বাল্যবিবাহের করুণ চিত্র

এই খবর পড়তে পড়তে সাতক্ষীরার একটি ঘটনা মনে পড়ে যায়। গত বছর সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ উপকূলের এই জেলায় বাল্যবিবাহ নিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে দেখা হয়েছিল এক কিশোরীর সঙ্গে, যার ১৫ বছর বয়সে বিয়ে ঠেকিয়েছিল প্রশাসন। তার শ্রমজীবী পরিবারের বাবা-মায়ের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ছিল চোখে পড়ার মতো। মেয়েটির মা বলেছিলেন, ‘অন্য কারও বিয়ে কি বন্ধ রইল? খালি আমার মেয়ের বিয়ে বন্ধ হইল!’ মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ওই মেয়েটিও জানিয়েছিল, গত বছর তার পাঁচ সহপাঠীর বিয়ে হয়েছে, কিন্তু কেউ তা আটকায়নি।

বাল্যবিবাহ: আইন বনাম বাস্তবতা

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকারের নানা আইন ও কর্মসূচি থাকলেও, ঢাকার উচ্চবিত্ত পরিবারের শিশুশিল্পী থেকে সাতক্ষীরার আটপৌরে গ্রামের মাদ্রাসাশিক্ষার্থী—উভয় ক্ষেত্রেই এই প্রথা রয়ে গেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেমের মতে, নারী শিক্ষার প্রসার সত্ত্বেও নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত কোনো পরিবারই নারীদের ঘিরে বিয়েকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে বের হতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘নারীবিদ্বেষী প্রচার বাল্যবিবাহের মতো প্রথাকে আরও উৎসাহিত করছে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুযায়ী, ১৮ বছরের নিচের মেয়ে ও ২১ বছরের নিচের ছেলের বিয়ে বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য হয়, যার সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছরের কারাদণ্ড। তবে আইনের প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে। গাজীপুরের শ্রীপুরে ১৩ বছরের এক কিশোরীর বাবা-মা ‘১৮ বছরের আগে বিয়ে দেব না’ বলে মুচলেকা দিয়েও ভোরে মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমীন বলেন, ‘শুধু আইন সংস্কারের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ ঠেকানো সম্ভব নয়। গবেষণা করে পদক্ষেপ নিতে হবে।’

পরিসংখ্যানে ভয়াবহ চিত্র

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে প্রতিবেদন অনুসারে, দেশে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ, অপ্রাপ্তবয়স্ক প্রতি দুটি মেয়ের মধ্যে একটি বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। বাল্যবিবাহের কারণে কিশোরী মাতৃত্বও বেড়েছে, যার হার প্রতি হাজারে ৯২। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বাল্যবিবাহের ফলে দেশের উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদের সম্ভাবনা থেকে বছরে সাত থেকে আট বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে।

সাতক্ষীরায় চার দিনের একটি জরিপে দেখা গেছে, ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ৪৮ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়েছে দশম শ্রেণিতে ওঠার আগেই। বাল্যবিবাহের সঙ্গে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া ও কিশোরী গর্ভধারণ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বাল্যবিবাহের পেছনের কারণ

ব্র্যাকের সোশ্যাল এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড লিগ্যাল প্রটেকশন কর্মসূচির জরিপ অনুযায়ী, বাল্যবিবাহের পেছনে দারিদ্র্য বড় কারণ হলেও ধনী ও মধ্যবিত্ত পরিবারেও এর উচ্চ হার রয়েছে। দরিদ্র পরিবারে বাল্যবিবাহের হার ৬০ শতাংশের কাছাকাছি, মধ্যবিত্ত পরিবারে ৫৫ শতাংশ, উচ্চবিত্ত পরিবারে ৫০ শতাংশের বেশি। মজার বিষয় হলো, যে পরিবারে একটি মাত্র মেয়ে, সেখানে বাল্যবিবাহের হার ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত বেশি।

ফওজিয়া মোসলেমের মতে, নারীকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে বিয়েকেন্দ্রিক চিন্তা এখনো প্রাধান্য পায়। সাম্প্রতিক অস্থিরতা ও জটিলতার মধ্য দিয়ে অনেকে দ্রুত বিয়ে দিয়ে দায় সারতে চান।

আশার দিক: কিশোরীদের সংগ্রাম

এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যেও অনেক কিশোরী নিজের বাল্যবিবাহ ঠেকিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের মে মাসে বগুড়ায় দেখা এক মেয়ে নিজের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করে শিক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে, যা অন্য অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে আছে। তাসলিমা ইয়াসমীনের পরামর্শ হলো, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে মেয়েদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নেওয়া এবং স্কুলপর্যায়ে ব্যবস্থা জোরদার করা।

শিশুশিল্পীর বাগ্দান থেকে সাতক্ষীরার গ্রামের মেয়ের কাহিনি—বাল্যবিবাহের এই দ্বৈত চিত্র আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাখে: আইন ও সচেতনতা কি এই গভীর সামাজিক সমস্যা দূর করতে পারবে? উত্তর খুঁজতে আরও গবেষণা ও সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।