মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও আশির দশকের বাংলাদেশ: আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে উঠে এলো ত্যাগের গল্প
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি: আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে ত্যাগের গল্প

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও আশির দশকের বাংলাদেশ: আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে উঠে এলো ত্যাগের গল্প

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বাসদ একটি অনন্য আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে, যা ফজলুল হক অ্যাভিনিউ, বরিশাল নগরে ২৬ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই প্রদর্শনীতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের পুনর্গঠনের গল্প চিত্রিত হয়েছে, যা দর্শকদের হৃদয় স্পর্শ করেছে।

আশির দশকের বাংলাদেশ: যুদ্ধের ক্ষত ও পুনর্গঠনের সংগ্রাম

আশির দশকে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জীবন্ত ছিল। ছোটবেলায় মাঠে ফুটবল খেলতে গেলে প্রায়ই মানুষের হাড়গোড় কিংবা মাথার খুলি পাওয়া যেত, যা যুদ্ধের ভয়াবহতার নীরব সাক্ষী। অনেক পরিত্যক্ত পুকুর চোখে পড়ত, যেখানে মানুষের মৃতদেহ পচে–গলে গেছে, আর এলাকায় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ত পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতার গল্প।

রাস্তাঘাটে প্রায়ই দেখা যেত স্বজনহারা মানুষের আর্তনাদ, আর মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের বয়োবৃদ্ধ মানুষজন দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতেন। গ্রামের রাস্তায় যেসব মুরব্বিদের দেখা যেত গরমের দিনে, তাঁদের বেশির ভাগই একখানা লুঙ্গি পরে বেরোতেন, খালি গতরে খালি পায়ে। যাঁদের অবস্থা একটু ভালো, তাঁরা পায়ে খড়ম ব্যবহার করতেন, যা সেই সময়ের দারিদ্র্যের চিত্র তুলে ধরে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ত্যাগ ও বিজয়ের হাসি: সাধারণ মানুষের অবিস্মরণীয় সংগ্রাম

সেই সময়ে ভিক্ষাবৃত্তিতেও নিয়োজিত হয়েছিলেন অনেক অসহায় পরিবারের বয়োবৃদ্ধরা, যুদ্ধ কেড়ে নিয়েছিল তাঁদের পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য। তবু সেসব মানুষজনকে প্রায়ই হাসিমুখে থাকতে দেখা যেত, এই হাসি ছিল বিজয়ের হাসি, পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির আনন্দ। দেশ ও জাতির মুক্তির স্বার্থে ব্যক্তিগত আরাম–আয়েশ বিসর্জনের সুখ তাঁরা গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষা ছিল অবিস্মরণীয়, কারণ তখনকার প্রেক্ষাপটে বেশির ভাগ মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা ছিল শোচনীয়, দিন আনি দিন খাই অবস্থা। ১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের প্রায় তিন থেকে পাঁচ লাখ লোকের প্রাণহানি হয়, কিন্তু সেই ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের পর জীবিতদের পুনর্বাসন নিয়ে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর নিষ্ঠুরতা এ দেশের নিরন্ন সাধারণ মানুষ মেনে নিতে পারেনি।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে যাত্রা

বাঙালি জাতি ঐতিহাসিকভাবেই স্বাধীনচেতা, বারবার বিদেশি শক্তির কাছে পরাভূত হলেও সময় ও সুযোগ অনুসারে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের শাসক হয়, কিন্তু দুই শ বছরের নিপীড়ন থেকে মুক্তিলাভের পর ধর্মীয় জিকির তুলে আরেকটি জাতির প্রভুগিরি মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না।

১৯৭০–এর নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করার পরও ক্ষমতা হস্তান্তরে কালক্ষেপণ ও কূটকৌশল অবলম্বন করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। ১৯৭১ সালের পঁচিশে মার্চ কালরাতে বাংলাদেশের নিরীহ ঘুমন্ত মানুষদের ওপর বর্বরোচিত হামলা করে পাকিস্তানি সেনারা, যা একটি সশস্ত্র সংগ্রামকে অপরিহার্য করে তোলে।

মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব ও জাতির জাগরণ

২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের অমোঘ কণ্ঠ এই জাতিকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিরলস আন্দোলন–সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তৈরি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ ও উদ্দীপনা দিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন বঙ্গবীর জেনারেল এম এ জি ওসমানী।

আশির দশকের সাংস্কৃতিক প্রভাব ও জাতীয় পুনর্গঠন

আশির দশকে এরশাদ সরকারের আমলে বিটিভির রাত আটটা কিংবা ১০টার সংবাদ প্রচারের পূর্বে ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’ গানটি প্রচারিত হতো, যা সাদাকালো টেলিভিশনে শোনার সময় পুরো শরীরের রোমকূপ দাঁড়িয়ে যেত। এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব হতো, মনে হতো জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আত্মারা প্রকম্পিত বাতাসের প্রবাহে জাতীয় পতাকায় ঢেউ তোলার মতো করেই ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আমরা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, কিন্তু যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ দেখেছি আশির দশকে, যখন দেশ পুনর্গঠনে বিভিন্ন এলাকায় অনেক মানুষ স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছেন উদারভাবে। রাস্তাঘাট মেরামত, অস্থায়ী পুল-সাঁকো নির্মাণ ও মেরামত, পুকুর–খাল খনন ইত্যাদি কাজে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন স্বেচ্ছাসেবীরা, মূলত সবার পরিশ্রমেই বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে আশির দশক থেকে।

জাতির অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে যাত্রা

বিশ্বে যেসব জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, তাদের সবারই আছে সমৃদ্ধ ইতিহাস, আর একাত্তর সাল আমাদের সমৃদ্ধি ও গৌরবময় ইতিহাসের পাতায় একটি অনবদ্য সংযোজন। যে জাতি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয়ের মুকুট অর্জন করেছে, সে জাতি তার ক্রমাগত অগ্রযাত্রায় সমৃদ্ধতর হবেই, কারণ দেশ ও জাতির অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কোনোকালেই রাতারাতি হয় না, সময়ের পরিক্রমায় অর্জিত হয়।

একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতি হিসেবে আমাদের অর্জন কম নয়, আমাদের গার্মেন্টস শিল্প বিশ্বে নেতৃস্থানীয়। বাংলাদেশের প্রশিক্ষিত সেনারা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন, আর প্রবাসী শ্রমিকেরা কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন। এভাবে সর্বস্তরের মানুষের প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে জাতি হিসেবে আমরা একদিন সম্মানের জায়গায় অধিষ্ঠিত হব, যা এই আলোকচিত্র প্রদর্শনী স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।