কারওয়ান বাজারে গরিবের মাংসের দোকান: আবদুল জলিলের মায়ের দোয়া মাংস বিতান
কারওয়ান বাজারের কামারপট্টির আবদুল জলিলের মায়ের দোয়া মাংস বিতান একটি অনন্য উদ্যোগ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই দোকানটি বিশেষভাবে গরিব ও খেটে খাওয়া মানুষের জন্য মাংস বিক্রি করে, যেখানে ১০০ গ্রাম বা ২৫০ গ্রামের মতো ছোট পরিমাণে মাংস কেনা যায়। আজ সকালে তোলা ছবিতে দেখা গেছে, ভ্যানগাড়িতে সাজানো এই মাংসের দোকানে ক্রেতাদের ভিড় লেগে আছে।
খেটে খাওয়া মানুষের মাংস কেনার সুযোগ
কারওয়ান বাজার কিচেন মার্কেটের পাশের রাস্তা ধরে কাঠপট্টির দিকে এগোলে কামারপট্টিতে একটি ভ্যানগাড়ি চোখে পড়বে। সাধারণত কারওয়ান বাজারে মালামাল পরিবহনের জন্য ভ্যানগাড়ি দেখা যায়, কিন্তু এখানে এটি মাংস বিক্রির দোকান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আবদুল জলিলের এই উদ্যোগ গরিবের মাংসের দোকান হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে, কারণ এখানে ১০০ গ্রাম, ২৫০ গ্রাম মাংস কেনার সুবিধা রয়েছে। কারওয়ান বাজার ও আশপাশের অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য এটি এখন একটি নির্ভরযোগ্য স্থান।
আজ শনিবার বেলা ১১টার দিকে আবদুল জলিলের মাংসের দোকানের সামনে ছোটখাটো জটলা দেখা গেছে। প্রায় ৮–৯ জন ক্রেতা মাংস কিনতে এসেছেন, যাঁরা সবাই খেটে খাওয়া মানুষ। তাঁদের মধ্যে কেউ ২৫০ গ্রাম, কেউবা ১০০ গ্রাম মাংস কিনেছেন, এমনকি দুই–একজন ৫০০ গ্রাম মাংসও ক্রয় করেছেন।
হেলাল মিয়ার অভিজ্ঞতা
হেলাল মিয়া কারওয়ান বাজার রেললাইনের পাশের বস্তিতে পরিবারসহ বসবাস করেন এবং মুটেমজুরের কাজ করে দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করেন। তিনি আবদুল জলিলের দোকানে মাংস কিনতে এসে বলেন, ‘এবার ঈদে বাড়ি যাইনি। ঈদের সময় মুরগি খেয়েছি, কিন্তু বাচ্চারা দুই–তিন দিন ধরে আবার মাংস খাওয়ার আবদার করছে। তাই আজ ২৫০ গ্রাম গরুর মাংস কিনলাম। ১১ টুকরা মাংস পেয়েছি, যা দিয়ে চারজনের এক বেলা বেশ ভালোভাবে খাওয়া যাবে।’
আবদুল জলিলের সেবামূলক উদ্যোগ
আবদুল জলিল গত চার বছর ধরে কারওয়ান বাজারে মাংস বিক্রি করছেন। তিনি মধ্যবিত্ত সাধারণ ক্রেতাদের পাশাপাশি খেটে খাওয়া মানুষের জন্যও মাংস বিক্রি করেন। যাঁদের পক্ষে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় এক কেজি মাংস কেনা সম্ভব নয়, তাঁদের জন্য তিনি ১০০ গ্রাম, ২৫০ গ্রাম মাংস বিক্রি করেন, যা ব্যাপক সাড়া পেয়েছে।
আজ সকালে মায়ের দোয়া মাংস বিতানে দেখা গেছে, এক কেজি মাংসের দাম ৭৮০ টাকা। ১০০ গ্রাম মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়, যা থেকে ৪–৫ টুকরা মাংস পাওয়া যায়। আর ২৫০ গ্রাম মাংস বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়, যাতে ১১–১২ টুকরা মাংস মেলে।
ভ্যানগাড়ির সামনেই আবদুল জলিলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনি বলেন, ‘দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করেন এমন মানুষের পক্ষে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় এক কেজি গরুর মাংস কেনা সম্ভব নয়। কিন্তু তিনিও পরিবার–পরিজন নিয়ে এক বেলা মাংস খেতে চান। তাঁদের জন্য ১০০ গ্রাম, ২৫০ গ্রাম মাংস বিক্রি করি। ২৫০ গ্রাম মাংস দিয়ে ছোটখাটো পরিবার এক বেলা খেতে পারেন, এবং মাংসের ঝোল হলেও অনেকে চালিয়ে নিতে পারেন।’
ব্যবসার বিস্তারিত
জানা গেছে, মায়ের দোয়া মাংস বিতানে দিনে একটি গরুর মাংস বিক্রি করা হয়। কারওয়ান বাজারের কামারপট্টিতে সকাল ৭টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত মাংস বেচাকেনা চলে। রাস্তার ওপর একটি ভ্যানগাড়িতে এই ব্যবসা পরিচালিত হয়, এবং সেখানে একটি সাইনবোর্ড রয়েছে। এই সাইনবোর্ডে প্রতিদিনের গরুর মাংসের দর লেখা থাকে, পাশাপাশি ১০০ গ্রাম, ২৫০ গ্রাম মাংস বিক্রি হয়—এটিও উল্লেখ করা আছে।
মাংসের বাজার পরিস্থিতি
গত কয়েক বছর ধরেই মাংসের দাম বেশ চড়া, যা মধ্যবিত্তের পক্ষেও মাংস কিনে খাওয়া কষ্টকর করে তুলেছে। সাধারণ মাংসের দোকানে ৫০০ গ্রাম বা এক কেজির নিচে মাংস বিক্রি হয় না, ফলে গরিব মানুষের জন্য মাংস কিনে খাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অবশ্য কিছু চেইনশপ, যেমন স্বপ্ন, ১০০ গ্রাম বা ২০০ গ্রাম মাংস বিক্রি শুরু করেছে, কিন্তু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এসব অভিজাত দোকান থেকে গরিব মানুষের পক্ষে মাংস কেনা প্রায় অসম্ভব।
এই প্রেক্ষাপটে আবদুল জলিলের মায়ের দোয়া মাংস বিতান একটি সামাজিক সেবার মডেল হিসেবে কাজ করছে, যা গরিব ও নিম্ন আয়ের মানুষদের মাংস খাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।



