বগুড়ায় ভেজাল জিরা প্রস্তুতের দায়ে কারখানার মালিককে তিন লাখ টাকা জরিমানা
বগুড়া জেলায় ভেজাল জিরা প্রস্তুতের অভিযোগে এক কারখানার মালিককে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গত সোমবার জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং র্যাবের যৌথ অভিযানে এই জরিমানা আদায় করা হয়। সদর উপজেলার এরুলিয়া এলাকায় একটি গুদামে অভিযান চালিয়ে জিরার সঙ্গে ক্যারাওয়ে সিড ভেজাল মেশানোর হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়া যায়।
অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ
অভিযানে নেতৃত্ব দেন বগুড়া জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফয়সাল আহমাদ। গুদামে আমদানি করা জিরার সঙ্গে কম দামের ক্যারাওয়ে সিড মিশিয়ে ভারতীয় ব্র্যান্ড ‘বিটি ডায়মন্ড জিরা’ নামে মোড়কজাত করার কারবার চলছিল। শাহিদ আলম নামের ব্যবসায়ীকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং ৪২ বস্তা জিরা ও ১৯২ বস্তা ক্যারাওয়ে সিড জব্দ করা হয়। জব্দকৃত মসলা যথাযথভাবে বিক্রির জন্য বগুড়া আমদানিকারক ও মসলা ব্যবসায়ী সমিতিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভেজাল মসলার বাজার ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
বগুড়া জেলা মসলা আমদানিকারক এবং মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি পরিমল প্রসাদ (রাজ) জানান, বগুড়ায় বছরে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি মসলা আমদানি হয়। এই বিশাল বাজারকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি ভেজাল মসলার কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। ভেজাল মসলা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, যা মসলার গুণগত মান নষ্ট করছে এবং আমদানিকারকদের আস্থা হ্রাস করছে।
বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের নেফ্রোলজি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক এহসানুল করিম সতর্ক করে বলেন, ভেজাল মসলায় ক্ষতিকর রাসায়নিক বা রং মিশানো হলে তা মানবদেহে ক্যানসার ছড়ানো, কিডনি ও যকৃৎ বিকল করে মৃত্যু ডেকে আনতে পারে।
অন্যান্য অভিযান ও জরিমানা
শুধু সাম্প্রতিক অভিযানই নয়, গত দেড় বছরে বগুড়ায় অন্তত ১০টি বড় অভিযান চালানো হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ:
- ফতেহ আলী বাজারের দুটি অনুমোদনহীন মসলা কারখানায় অভিযান চালিয়ে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
- দোলন মসলা মিলে পচা মরিচের সঙ্গে ধানের তুষ মিশিয়ে গুঁড়া মরিচ তৈরি করায় মালিককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
- বগুড়া হলুদ মিলে নষ্ট হলুদ ভেজাল মিশিয়ে সংরক্ষণ করায় মালিককে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
- রাজাবাজারে কাপড়ের রং, গোখাদ্য ও তুষ ব্যবহার করে হলুদ-মরিচের গুঁড়া তৈরির দায়ে আল-আমিন মসলা মিলে তিন লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।
এইসব অভিযান সত্ত্বেও ভেজাল মসলার কারবার থামছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। আমদানিকারকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, অসাধু কারবারিদের কারণে মসলার গুণগত মান ঠিক থাকছে না এবং বগুড়ার ব্যবসায়ীদের প্রতি দেশব্যাপী আস্থা কমছে।
প্রশাসনের ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ
জেলা প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নানা সময়ে ভেজাল মসলার কারবার বন্ধে অভিযান পরিচালনা করে জেল-জরিমানা দিলেও অসাধু তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান এবং ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক ফজিলাতুন্নেসা ফৌজিয়ার মতো কর্মকর্তারা সাম্প্রতিক অভিযানে অংশ নিয়েছেন।
পরিমল প্রসাদ (রাজ) দাবি করেন, অসাধু ব্যবসায়ীদের তৎপরতা ঠেকাতে প্রশাসনের অভিযান আরও জোরদার করা দরকার। তিনি বলেন, “ভেজাল মসলা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, যা মসলার সঠিক গুণগত মান ঠিক রাখতে বাধা দিচ্ছে।”
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বগুড়া কার্যালয়ের কর্মকর্তা মো. রাসেল জানান, আমদানি করা জিরার পাইকারি মূল্য প্রতি কেজি ৫৬০ থেকে ৫৮০ টাকা, অন্যদিকে ক্যারাওয়ে সিডের মূল্য প্রতি কেজি ২৪০ টাকা। কম দামের ক্যারাওয়ে সিড মিশিয়ে জিরা বিক্রি করা ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা বলে তিনি মন্তব্য করেন।



