চট্টগ্রামের বেকারি ও রেস্তোরাঁয় তেলাপোকার দাপট, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য তৈরি
চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন বেকারি ও রেস্তোরাঁয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযানে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গত ১০ দিনে অন্তত ৫টি প্রতিষ্ঠানে তেলাপোকা, ইঁদুরের বিচরণ এবং স্যাঁতসেঁতে, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ পাওয়া গেছে। এসব স্থানে তৈরি খাবার ক্রেতাদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
হারুন বেকারিতে তেলাপোকার ফ্যাক্টরি
গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড় এলাকায় হারুন বেকারিতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অভিযান চালান। প্রতিষ্ঠানটির রান্নাঘরে ঢুকেই তারা রীতিমতো অবাক হয়ে যান। দেয়ালজুড়ে কয়েক শ তেলাপোকার বিচরণ দেখা যায়, যেগুলো রান্নাঘরে ঘোরাঘুরি করছিল। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে খাদ্য তৈরিতে কোনো স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছিল না।
অধিদপ্তরের উপপরিচালক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, ‘ছোট একটা বেকারি; দেখলে মনে হয় তেলাপোকার ফ্যাক্টরি। আমরা রান্নাঘরে ঢুকেই রীতিমতো অবাক হয়েছি। দেয়ালজুড়ে তেলাপোকার বিচরণ। রান্নাঘরে সেগুলো ঘোরাঘুরি করছিল।’ প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে সাময়িক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও একই চিত্র
শুধু হারুন বেকারি নয়, গত কয়েক দিনে চট্টগ্রাম নগরের আরও কয়েকটি নামী প্রতিষ্ঠানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ পাওয়া গেছে।
- কাচ্চি ডাইন: গত ২৬ ফেব্রুয়ারি চকবাজার এলাকায় এই রেস্তোরাঁয় পরিদর্শনে গিয়ে তেলাপোকা ও ইঁদুরের বিচরণ দেখা যায়।
- বারকোড সুইটস: ১ মার্চ মুরাদপুর এলাকায় এই কনফেকশনারির রান্নাঘরে তেলাপোকা-ছারপোকার বিচরণ ও বিড়ালের উপস্থিতি লক্ষ্য করা হয়।
- বিএসপি ফুড প্রোডাক্টস: গত বুধবার কালুরঘাট এলাকায় এই প্রতিষ্ঠানের রান্নাঘরেও তেলাপোকা পাওয়া যায়।
- হোম রেসিপি ফুড বেকারি: গতকাল বৃহস্পতিবার গরীবুল্লাহ শাহ হাউজিং এলাকায় এই বেকারিতেও একই সমস্যা দেখা দেয়।
নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তারা জানান, এই চারটি প্রতিষ্ঠানের রান্নাঘরই স্যাঁতসেঁতে ও অপরিচ্ছন্ন ছিল। অনেক প্রতিষ্ঠানকে আগে জরিমানা ও সতর্ক করা হলেও তারা আবার একই ভুল করছে। জরিমানা দেওয়ার পর সাময়িকভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলেও পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে।
ক্ষতিকর রাসায়নিকের অবাধ ব্যবহার
অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ক্ষতিকর রাসায়নিকের অবাধ ব্যবহারও চোখে পড়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার চকবাজার এলাকায় সাতকানিয়া ভাতঘর নামের প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে জেলা প্রশাসন জিলাপি তৈরিতে হাইড্রোজ বা সোডিয়াম হাইড্রো সালফাইডের ব্যবহার দেখতে পায়। এই রাসায়নিকটি পোশাক খাতে ব্যবহৃত হয় এবং খাদ্যপণ্যে ব্যবহারযোগ্য নয়।
কর্মকর্তারা বলছেন, হাইড্রোজের ড্রামে স্পষ্টভাবে লেখা আছে যে এটি ব্যবহারের সময় খাওয়া বা পান করা যাবে না, কারণ এটি বাতাসে ক্ষতিকর কণা ছড়ায়। দীর্ঘ সময় বা অতিরিক্ত মাত্রায় এর সংস্পর্শে এলে কিডনির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং মেধাশক্তি দুর্বল করে দিতে পারে। গোপালজল ও কেওড়াজলের মতো নিষিদ্ধ পদার্থও খাবারে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞ মতামত
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি খাবার মানুষের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তেলাপোকা বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও জীবাণু বহন করে, যা খাবারের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ডায়রিয়া, আমাশয়, ফুড পয়জনিংসহ নানা রোগের কারণ হতে পারে।’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘জরিমানা করে এসব প্রতিষ্ঠানকে ছাড় দেওয়ার কারণে তারা একই ভুল আবার করে। যেহেতু সিলগালা করে দেওয়ার বিধান আছে, তাই এসব প্রতিষ্ঠানকে কঠিন শাস্তি দিলে বাকিরা সতর্ক থাকবে।’ তিনি স্থায়ীভাবে সিলগালা করে দেওয়ার মতো শাস্তির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এই অভিযানগুলো চালিয়ে চলেছে বলে জানানো হয়েছে। ভোক্তাদের সচেতনতা ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এই সমস্যা কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।



