অরুন্ধতী রায়ের তীব্র নিন্দা: ইরান হামলা ও ভারতের 'মেরুদণ্ডহীন' অবস্থানের সমালোচনা
ভারতের প্রখ্যাত লেখক অরুন্ধতী রায় গত ৯ মার্চ নয়াদিল্লির কামানি মিলনায়তনে তাঁর বই 'মাদার মেরি কামস টু মি' নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। অনুষ্ঠানের শেষভাগে তিনি বক্তব্য শুরু করে বলেন, 'আমার কিছু বলার আছে, কারণ আমি আমার মায়ের মেয়ে এবং আমি শিরদাঁড়া সোজা করে তা বলতে চাই। ছোট্ট একটি কথা, বিশ্বকে গ্রাস করতে চলা এক যুদ্ধ নিয়ে।'
ইরান হামলার নিন্দা ও গাজা গণহত্যার ধারাবাহিকতা
অরুন্ধতী রায় তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, তেহরান, ইসফাহান ও বৈরুতের মতো শহরগুলো যখন আগুনে পুড়ছে, তখন তিনি মাদার মেরির স্পর্ধিত চেতনার সঙ্গে সংগতি রেখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার কথা বলতে চান। তিনি এটিকে গাজায় চলমান মার্কিন-ইসরায়েলি গণহত্যার ধারাবাহিকতা হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, 'একই কৌশল, যা আগেও দেখেছি। নারী ও শিশুহত্যা, হাসপাতাল বোমা হামলা, শহর ধ্বংস, তারপর নিজেরাই ভুক্তভোগী হওয়ার ভান করা।' গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।
ভারত সরকারের 'মেরুদণ্ডহীন' অবস্থানের তীব্র সমালোচনা
অরুন্ধতী রায় মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে ভারত সরকারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, 'ইরান যখন প্রতিরোধ করছে, ভারত তখন ভয়ে মূর্ছিত। আমাদের সরকার এতটা মেরুদণ্ডহীন, ভেবে আমি লজ্জিত।' তিনি আরও যোগ করেন যে, ভারত অর্থনীতিতে বড় হলেও গর্ব, মর্যাদা ও সাহস হারিয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, 'আমাদের নির্বাচিত সরকার কেন যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা করতে পারে না, যখন তারা অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের অপহরণ বা হত্যা করে?' প্রধানমন্ত্রীর ইসরায়েল সফর ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আলিঙ্গনের ঘটনাকেও তিনি সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখেন।
ইরানের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন ও বৈশ্বিক সংকটের সতর্কতা
অরুন্ধতী রায় ইরানের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন প্রকাশ করে বলেন, 'আমি নিঃশর্তভাবে ইরানের পাশে আছি। কোনো দেশের শাসনব্যবস্থা বদলাতে হলে তা সে দেশের জনগণকেই করতে হবে।' তিনি সতর্ক করে দেন যে, এই নতুন যুদ্ধ পুরো বিশ্বকে গ্রাস করতে পারে এবং বিশ্ব পারমাণবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমা ফেলার ইতিহাস টেনে এনে বলেন, 'যে দেশ হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমা ফেলেছিল, তারা আবারও বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতাগুলোর একটিতে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।'
বই অনুষ্ঠান ও ব্যক্তিগত জীবন আলোচনা
অনুষ্ঠানের শুরুতে 'মাদার মেরি কামস টু মি' বইটি নিয়ে আলোচনা হয়। অরুন্ধতী রায় বইটিকে সরাসরি আত্মজীবনী না বলে 'একজন ঔপন্যাসিকের স্মৃতিকথা' হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি তাঁর মা মেরি রায়ের সঙ্গে জটিল সম্পর্কের গল্প শোনান, যিনি একদিকে কঠোর মা, অন্যদিকে নারীর অধিকার রক্ষায় লড়াই করা অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তিত্ব।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ
অনুষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়েও কথা বলেন অরুন্ধতী রায়। তিনি বলেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ধীরে ধীরে মানুষের প্রকৃত বুদ্ধিমত্তাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, 'আগে আমরা একটি ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়ছিলাম, এখন আমরা একটি ফ্যাসিবাদী সমাজের বিরুদ্ধে লড়ছি।' সাফল্য প্রসঙ্গে তিনি যোগ করেন যে, করপোরেট বিশ্বায়ন, যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে লিখতে লিখতে সাফল্য উদযাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
দর্শকদের সমর্থন ও প্রতিরোধের বার্তা
অনুষ্ঠানের শেষভাগে অরুন্ধতী রায়ের রাজনৈতিক বক্তব্যে উপস্থিত দর্শকেরা দাঁড়িয়ে সমর্থন জানান। জবাবে তিনি হাসিমুখে 'বিজয়' চিহ্ন দেখিয়ে বলেন, 'দিল্লিতে আমরা সব সময় প্রতিরোধ করি।' এই অনুষ্ঠানে লেখক নীলাঞ্জনা রায়ের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন তিনি, যা বইয়ের আলোচনা থেকে শুরু হয়ে বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংকট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।



