বিভূতিভূষণের 'চাঁদের পাহাড়': ৯০ বছর আগের সেই কালজয়ী অ্যাডভেঞ্চারের পোর্টাল
পড়াশোনার ফাঁকে কি কখনো মনে হয়েছে, যদি কোনো পোর্টালের মাধ্যমে সরাসরি অন্য কোনো জগতে চলে যাওয়া যেত? ১৯৩৭ সালেই বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট কথাশিল্পী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের জন্য ঠিক এমনই একটি পোর্টাল খুলে দিয়েছিলেন, যার নাম 'চাঁদের পাহাড়'।
আধুনিক যুগের ফ্যান্টাসিকে হার মানানো এক মহাকাব্য
বর্তমান সময়ে আমরা 'ইসেকাই' বা সমান্তরাল মহাবিশ্বের গল্প খুঁজে বেড়াই রোমাঞ্চের সন্ধানে। কিন্তু প্রায় ৯০ বছর আগে এক বাঙালি লেখক শুধুমাত্র কলমের আঁচড়ে আমাদের এমন এক পৃথিবীতে নিয়ে গিয়েছিলেন, যা আধুনিক যুগের যেকোনো ফ্যান্টাসি বা থ্রিলার সৃষ্টিকে পিছনে ফেলে দিতে সক্ষম। এই কালজয়ী ক্ল্যাসিক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে কিশোর-তরুণদের মনে অ্যাডভেঞ্চারের অদম্য স্পৃহা জাগিয়ে তুলছে।
কল্পনাশক্তির অসীম কারিগর বিভূতিভূষণ
এই অসাধারণ 'পোর্টাল' সৃষ্টির কারিগর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী হিসেবে স্বীকৃত। তিনি মূলত প্রকৃতির রূপকার হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর কল্পনাশক্তি ছিল সত্যিই অসীম ও অনন্য। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি জীবনে কখনো ভারতের সীমানা পেরিয়ে যাননি। শুধুমাত্র মানচিত্র ও গভীর পড়াশোনার ভিত্তিতে তিনি আফ্রিকার ভৌগোলিক বর্ণনা এতটাই নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করেছেন যে তা বর্তমান যুগের গুগল ম্যাপকেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে।
পথের পাঁচালী-তে অপুর জীবনের স্নিগ্ধ চিত্রাঙ্কনের পাশাপাশি 'চাঁদের পাহাড়'-এর মতো রোমাঞ্চকর ও হাড় হিম করা গল্প রচনা করতে পারাটা তাঁর বহুমুখী সাহিত্য প্রতিভারই উজ্জ্বল প্রমাণ।
শঙ্করের আফ্রিকান অভিযান: স্বপ্ন ও বাস্তবতার সংঘাত
এই উপন্যাসের মূল চরিত্র শঙ্কর বাংলার এক সাধারণ গ্রামের শিক্ষিত যুবক, যার জীবনের লক্ষ্য কেবল দৈনন্দিন অফিসের কাজ নয়। বরং তার স্বপ্ন দিগন্তরেখা ছাড়িয়ে অজানা ও অনাবিষ্কৃত জগতের সন্ধানে বেরিয়ে পড়া। ভাগ্য তাকে সুযোগ করে দেয় আফ্রিকার উগান্ডা রেলওয়েতে চাকরি পাওয়ার। কিন্তু সেখানে পৌঁছে শঙ্কর দ্রুত বুঝতে পারে যে আফ্রিকার অরণ্য কোনো সাধারণ ভ্রমণের স্থান নয়।
সেখানে প্রতিটি ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে আছে সরাসরি মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা। কখনো মানুষখেকো সিংহ, কখনো বিষাক্ত ব্ল্যাক মাম্বা সাপ, আবার কখনো অজানা কোনো হিংস্র শ্বাপদ। ঠিক এই সময়েই শঙ্করের জীবনে প্রবেশ করে দিয়েগো আলভারেজ নামের এক অভিজ্ঞ পর্তুগিজ অভিযাত্রী। আলভারেজের মুখে শঙ্কর শোনে এক রহস্যময় পাহাড়ের গল্প—রিখটারসভেল্ড পর্বত।
এই পর্বতে লুকিয়ে আছে অগাধ হীরার খনি, কিন্তু সেই খনিকে পাহারা দিচ্ছে আদিম অরণ্যের এক অতিপ্রাকৃত বিভীষিকা, যার নাম 'বুনইপ'। নিজের আরামদায়ক ও নিরাপদ জীবনকে তুচ্ছ করে শঙ্কর ও আলভারেজ কি পারবে সেই দুর্গম পাহাড় জয় করতে? নাকি প্রকৃতির এই বিশালত্ব ও ভয়াবহতার কাছে হারিয়ে যাবে তাদের অস্তিত্ব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পাঠকদের টপকাতে হবে 'চাঁদের পাহাড়'-এর প্রতিটি পাতা।
প্রকৃতি: উপন্যাসের প্রধান চরিত্র
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই উপন্যাসে প্রকৃতিকে কেবল একটি পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং প্রকৃতি নিজেই এখানে একটি সক্রিয় ও প্রভাবশালী প্রধান চরিত্রের মর্যাদা পেয়েছে। বইটির প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি যে রহস্য ও উত্তেজনার সৃষ্টি করেছেন, তা পাঠককে এক মুহূর্তের জন্যও বই থেকে চোখ সরাতে দেয় না। অনেক অ্যাডভেঞ্চার গল্পে প্রধান চরিত্রকে অতিমানবীয় শক্তির অধিকারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়, কিন্তু শঙ্কর সম্পূর্ণরূপে রক্তমাংসের মানুষ।
তার ভয় পাওয়া, মানসিক দৃঢ়তা অর্জন, শারীরিক ক্লান্তি এবং একাকিত্বের সঙ্গে নিরন্তর লড়াই তাকে পাঠকদের কাছে অত্যন্ত আপন ও বিশ্বাসযোগ্য চরিত্রে পরিণত করেছে। এ ছাড়া এই বই পড়ার মাধ্যমে পাঠকরা আফ্রিকার ভৌগোলিক অবস্থান, বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা সম্পর্কে মূল্যবান জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন, যা তাদের জ্ঞানভান্ডারকে নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ করবে।
সাবলীল ভাষায় রচিত অমর সৃষ্টি
অনেকের ধারণা পুরোনো দিনের বই মানেই দুর্বোধ্য ও কঠিন ভাষা। কিন্তু 'চাঁদের পাহাড়'-এর ভাষা এতটাই সাবলীল, প্রাঞ্জল ও প্রবাহমান যে পড়তে গিয়ে কোথাও বাধার সম্মুখীন হতে হয় না। এই উপন্যাস কেবল একটি অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি নয়, এটি মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সাহসিকতা এবং জ্ঞানের প্রতি অনন্ত কৌতূহলের জয়গান।
যারা কল্পনাপ্রিয় ও বইপোকা হিসেবে পরিচিত, তাদের জন্য 'চাঁদের পাহাড়' নিঃসন্দেহে কল্পনাশক্তিকে এক সম্পূর্ণ নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। যদি কল্পনায় জীবনের সবচেয়ে বড় ও রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চারে অংশ নিতে চান, তবে আজই এই সাহিত্যিক পোর্টালটি খুলে ফেলুন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অমর সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।



