রাজা জ্যাঠার 'মধুগীতালি': এক শৈশবের রহস্যময় আবাস
টিউনমণ্ডলপাড়া মহল্লায় রাজা জ্যাঠার বাড়ি 'মধুগীতালি' ছিল আমাদের ছেলেবেলার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। ননীচরণ সাহা ও গীতারাণী সাহার এই বাড়িটির নামকরণ করা হয়েছিল ননীচরণের ডাকনাম 'মধু' থেকে। মহাযুদ্ধের পর ননীচরণ সাহা বাড়িটি বিক্রি করে চলে যান, এবং রাজা জ্যাঠার পরিবার জিয়াগঞ্জ থেকে এসে এখানে বসবাস শুরু করে। বাড়ির নাম তারা পরিবর্তন করেননি, আর সেই সূত্রেই 'মধুগীতালি' আমাদের সবার হৃদয়ে স্থান পেয়ে যায়।
রাজা জ্যাঠার ব্যক্তিত্ব ও বাড়ির পরিবেশ
রাজা জ্যাঠার প্রকৃত নাম ছিল রাজদুলারা। তিনি প্রিন্সের মতো দর্শনীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন, যার দৈর্ঘ্য বসে থাকলেও স্পষ্ট বোঝা যেত। গরমের দুপুরে তিনি বসার ঘরের চৌকিতে ঘুমাতেন, আর আমরা দেখতাম তাঁর ধবধবে পিঠের একপাশ রক্ত জমে গোলাপি-লাল হয়ে আছে। জেঠিমার মৃত্যুর পর তিনি একা হয়ে পড়েন, এবং তাঁর সুদৃঢ় স্বাস্থ্য ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে শুরু করে।
বাড়িটিতে পুরনো বই ও পুঁথির বিশাল সংগ্রহ ছিল, যা বর্ষায় উইপোকার আক্রমণে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গিয়েছিল। অনেকগুলো ঘর তালাবদ্ধ থাকত, আর নোনা ধরা পাঁচিলের ভাঙা অংশ থেকে বেরিয়ে পড়েছিল হাতে তৈরি পাতলা গোল ইট। দেয়ালের ভিতের মাটি নাড়া দিলে কালো গন্ধ উঠত, আর শরতে গন্ধভাদাল লতার ফুলে ভরে যেত উঠান।
সন্ধ্যার আড্ডা ও গল্পের মোহ
আমরা বিকেল হলে 'মধুগীতালি'তে ভিড় করতাম, আর রাজা জ্যাঠা খুশি হয়ে উঠতেন। তাঁর মাছ ধরার নেশা, রান্নার দক্ষতা, গান গাওয়া ও গল্প বলার ক্ষমতা আমাদের মুগ্ধ করত। এক শীতের সন্ধ্যায়, আমরা মোটা পাঁচ ব্যাটারির টর্চ হাতে নিয়ে তাঁর বাড়িতে পৌঁছাই। সেখানে হারিকেনের আলোয় তিনি গলা সাধছিলেন, আর আমাদের জন্য চা ও ভাজা মুড়ি নিয়ে আসেন।
সেই সন্ধ্যায় তিনি তাঁর জীবনকাহিনি শোনান। তিনি মোগল আমলের পাটোয়ারী বংশের সন্তান, যাদের কর্নওয়ালিশের আমলে দপ্তর গুটিয়ে যায়। তাঁর বাবা পড়ালেখা করিয়ে এলএমএফ ডাক্তার বানান, আর রাজা জ্যাঠা দেওয়ানবাড়ির আশ্রয়ে থেকে কালোয়াতি গান শেখেন। তাঁর মাছ ধরার নেশা শুরু হয় জমিদারবাড়িতে থাকাকালীন, যখন তিনি জালশুখা গ্রামের জেলেদের সঙ্গে মিশে নৌকা উল্টে আলকাতরা বানাতেন।
চর মানিকপুরার রহস্যময় অভিজ্ঞতা
রাজা জ্যাঠা একবার শ্বশুরবাড়ি জামালপুরে গিয়ে চর মানিকপুরায় মাছ ধরতে যান। সেখানে তিনি এক রহস্যময় অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। এক সন্ধ্যায়, তিনি পেত্নীর কান্নার মতো আওয়াজ শুনতে পান, এবং হাতেম কাকার পরামর্শে একটি তেলাপিয়া মাছ ছুঁড়ে দিলে আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে তিনি একটি সাড়ে চৌদ্দ সের ওজনের কাতল মাছ ধরেন, যা নিয়ে গ্রামে হইচই পড়ে যায়।
পরের দিন, তিনি আজীজ ও লতিফের সঙ্গে চর মানিকপুরায় যান মাছ ধরতে। সেখানে শরীফুল নামের এক ছেলের সাহায্যে তারা বাগাডু মাছ ধরার চেষ্টা করেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে মাছটি বড়শি ছিঁড়ে পালিয়ে যায়। ফেরার পথে তারা রহস্যজনকভাবে পথ হারিয়ে ফেলেন, এবং এক বুড়ো লোকের লন্ঠন দেখে তা অনুসরণ করতে গিয়ে আরও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। তারা খালে ঝাঁপ দিতে গিয়ে দেখেন সেটি শুকনো কাদা, এবং শেষ পর্যন্ত নদীর পাড়ে পৌঁছে নৌকায় করে নিরাপদে ফিরে আসেন।
গল্পের শেষ ও স্মৃতির মোহ
বাড়ি ফিরে তারা দেখেন তাদের ধরা মাছের সংখ্যা কমে গেছে, এবং স্থানীয়রা মনে করে খারাপ আত্মা তাদের সঙ্গী ছিল। রাজা জ্যাঠা এই গল্পের শেষ কখনোই সম্পূর্ণ বলেননি, যেন জানতেন আমরা আবার ফিরে আসব। লোটন, তাঁর পালিতা মেয়ে, আমাদের প্রত্যেককে বলত যে তার ক্ষমতা থাকলে সে আমাদের কোথাও যেতে দিত না। সময়ের সাথে সাথে আমরা 'মধুগীতালি' থেকে দূরে সরে যাই, কিন্তু রাজা জ্যাঠার গল্প ও সেই রহস্যময় বাড়ির স্মৃতি আজও আমাদের হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে।
রাজা জ্যাঠার শেষ বয়স কীভাবে কেটেছে তা আমরা জানি না, কিন্তু শীতের সন্ধ্যায় কেরোসিন-জাদাক-সিন্দুকের ঘ্রাণে আজও মনে পড়ে যায় সেই টালি-খসা বাড়ি ও আমাদের আড্ডার দিনগুলি। সময়ের খাঁড়িতে আমরা জাল ফেলেছি, কখনো মাছ পেয়েছি, কখনো শুধুই গেঁড়িগুলি, আর এখন সংসারে নিরবচ্ছিন্ন উপযোগিতা ফুরিয়ে গেছে আমাদেরও।



