ঈদ সংখ্যার সোনালি দিন: যখন বই ছিল হিরামাণিক্যের সিন্দুক
আমাদের সময়ে ঈদ সংখ্যা মানে ছিল এক অপার উৎসবের আনন্দ। প্রিন্স মাহমুদ, আইয়ুব বাচ্চু, জেমস কিংবা হাসানের গান দিয়ে ভরা ফিতার ক্যাসেটের মতোই ঈদসংখ্যাগুলো ছিল জ্ঞান ও সাহিত্যের ভাণ্ডার। মাত্র একশ থেকে একশ বিশ টাকায় আমরা পেতাম ছয়টি উপন্যাস, বিচারপতি হাবিবুর রহমান স্যারের লেখা, সৈয়দ আবুল মকসুদের গবেষণাধর্মী রচনা কিংবা বিখ্যাত প্রয়াত লেখকের অপ্রকাশিত সৃষ্টি। এটি ছিল এক ধরনের হিরামাণিক্য বোঝাই সিন্দুক, যা আমাদের বুক শেলফকে সমৃদ্ধ করতো।
ঈদ সংখ্যার বিবর্তন: অতীত থেকে বর্তমানের পথচলা
অন্যদিন ম্যাগাজিন ঈদসংখ্যাকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল, যেখানে হুমায়ূন আহমেদের হিমু চরিত্র নিয়ে গবেষণাধর্মী লেখা ছাপা হতো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে দৈনিক পত্রিকাগুলোও ঈদসংখ্যা প্রকাশ করতে শুরু করে। যদিও সংখ্যা বেড়েছে, মানের দিক থেকে বিতর্ক রয়েছে। এখন ঈদসংখ্যায় রাজীব হাসানের লেখা ছাপা হয়, যা আমাদের মুরুব্বিদের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে: "আহা, আমাদের সময় কী ঈদসংখ্যাই না বের হতো!"
পাঠাভ্যাসের সংকট: কেন কমছে ঈদ সংখ্যার কদর?
ঈদ সংখ্যা পাঠকদের আগ্রহ হারানোর পেছনে সরাসরি কারণ নির্দেশ করা ঝুঁকিপূর্ণ, তবে সামগ্রিক পর্যবেক্ষণ বলছে পড়ার হারই কমে যাচ্ছে। পাঠক এবং লেখক উভয়েরই এতে দায় রয়েছে। বর্তমানে, একজন মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য কোটি কোটি কনটেন্ট লড়াই করছে, যার মধ্যে বই ও অন্যান্য মিডিয়া অন্তর্ভুক্ত। বই অন্যান্য কনটেন্ট থেকে আলাদা, কারণ এটি আমাদের মস্তিষ্ককে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগায়।
কল্পনাশক্তি ও বই পড়ার গুরুত্ব: কেন এটি অপরিহার্য?
বই পড়া সহজ কাজ নয়, এটি একটি সক্রিয় প্রক্রিয়া যেখানে পাঠককে কল্পনা করতে হয়। ভিডিও একটি প্যাসিভ মিডিয়াম, কিন্তু বই আমাদের ব্রেনের নিউরোনগুলোকে ব্যায়াম করায়, ঠিক যেমন দাবা খেলা বা পাজল করলে হয়। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব কিংবা উড়ার ধারণা—সবই শুরু হয়েছিল কল্পনা থেকে। যদি আমরা বই পড়া ছেড়ে দিই, এই কল্পনা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবো।
এআই-এর যুগে বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা:সামনের পৃথিবীতে এআই আমাদের মস্তিষ্ক দখল করতে পারে, আমাদের ভাবতে দিতে না চাইতে পারে। তখন জেন-জি বা জেন-আলফা নয়, বরং দুই দল মানুষ থাকবে: যারা বই পড়েছে এবং যারা পড়েনি, যারা ভাবতে পারে এবং যারা পারে না। তাই সামগ্রিক পাঠাভ্যাস নিয়ে সচেতনতা জরুরি।
ঈদ সংখ্যার ভবিষ্যৎ: একটি অনিশ্চিত যাত্রা
পড়ুয়াদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ঈদ সংখ্যা আর কতদিন টিকবে, তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। মাসিক-পাক্ষিক ম্যাগাজিনগুলো এখন মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমে ঢোকে না, দৈনিক পত্রিকার হকারের ছোটাছুটিও ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ঈদ সংখ্যা শিগগিরই নিদ্রায় যেতে পারে। তবে আপাতত, দেশ রূপান্তরের ঈদ সংখ্যা হাতে নিয়ে দেখা যায়, কাগজের মান ভালো না হলেও লেখার মান উল্লেখযোগ্য, যেমন আহমেদ খান হীরকের সোডাপপ গল্পটি দারুণ লাগছে।
সর্বোপরি, বই পড়া এবং ঈদ সংখ্যার ঐতিহ্য রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব, যাতে কল্পনাশক্তি ও জ্ঞানের আলো অক্ষুণ্ণ থাকে।


