নিষিদ্ধ ইরানি নভেলা 'Women Without Men' যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকায় মনোনীত হওয়া ইরানি লেখক শাহরনুশ পারসিপুরের নিষিদ্ধ নভেলা 'Women Without Men' প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত হয়েছে। ৮০ বছর বয়সি পারসিপুর ইরানের অন্যতম খ্যাতিমান লেখক এবং সবচেয়ে সাহসী ও মৌলিক নারীবাদী কণ্ঠগুলোর একজন হিসেবে পরিচিত।
কারাবন্দি ও সাহিত্যিক সংগ্রাম
১৯৮০–এর দশকে তার গল্পগুলো ইরানের সাহিত্যজগতে ব্যাপক আলোচনার বিষয় ছিল। সে সময় তাকে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই প্রায় পাঁচ বছর কারাবন্দি থাকতে হয়। পারসিপুর ৯০–এর দশকের মাঝামাঝি থেকে নির্বাসনে বাস করছেন এবং বর্তমানে সান ফ্রান্সিসকোর কাছে একটি ইরানি সম্প্রদায়ে বসবাস করেন।
উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও পটভূমি
১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানের সময়কার তেহরানকে পটভূমি করে লেখা 'Women Without Men' উপন্যাসটি জাদুবাস্তবতা এবং ঐতিহ্যবাহী ইরানি রূপকের মিশ্রণে নারীর শরীরের ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সমালোচনা করে। এতে পাঁচ নারীর গল্প বলা হয়েছে:
- মুনিস: ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি পেতে ছাদ থেকে ঝাঁপ দেয়, কিন্তু মৃত্যুর পরও গল্প বলা চালিয়ে যায়।
- ফায়েজেহ: ধার্মিক নারী, ধর্ষণের পর যার বিশ্বাস ভেঙে পড়ে।
- জাররিন: এক যৌনকর্মী, যে একসময় তার ক্রেতাদের মুখবিহীন দেখতে শুরু করে এবং সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
- মাহদোখত: যৌনতার ভয়ে এতটাই আতঙ্কিত যে সে একসময় গাছে রূপান্তরিত হয়।
- ফাররুখলাকা: মধ্যবিত্ত স্বামীকে ছেড়ে শহরের বাইরে একটি বাগান কিনে নেয়।
শেষ পর্যন্ত তারা সবাই সেই বাগানে একত্রিত হয়—যেখানে বিয়ে, পুরুষের নিয়ন্ত্রণ এবং যৌন লজ্জা থেকে সাময়িক আশ্রয় তৈরি হয়। ইরানে এখনও বইটি নিষিদ্ধ হলেও বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং ২০০৯ সালে এর চলচ্চিত্র সংস্করণও মুক্তি পায়।
কৌমার্য ও সামাজিক চাপ
পারসিপুরের মতে, গ্রেপ্তারের মূল কারণ ছিল কৌমার্য বা 'বেকারাত' নিয়ে লেখা। তিনি বলেন, "ইরানে কৌমার্যের গভীর সামাজিক অর্থ আছে। এটা বোঝায় এই নারী অন্য কারো সঙ্গে ছিল না। বিষয়টি খুবই শক্তভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত। আমার দাদি বলতেন, যে নারী কুমারী নয় সে দোজখে যাবে।"
ছোটোবেলায় নিজের শরীর পরীক্ষা করে তিনি ভুল করে ভেবেছিলেন যে তিনি কুমারীত্ব হারিয়ে ফেলেছেন, কারণ কেউ কখনো মেয়েদের শরীরের গঠন বোঝায়নি। "আমাকে কিছুই বলা হয়নি। আমি অনেক বছর ভেবেছি আমি কুমারী নই। সেই কষ্ট থেকেই এই বই লিখেছি—যাতে অন্য মেয়েরা এমন কষ্ট না পায়।"
নারীর স্বাধীনতা ও পরিবর্তন
পারসিপুর বলেন, "বছরের পর বছর নারীদের এমনভাবে প্রস্তুত করা হয় যেন তারা শুধু একজন পুরুষের জন্যই থাকবে।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, "প্রতিটি পুরুষই প্রথম হতে চায়। ইংরেজ পুরুষ, আমেরিকান পুরুষ—সবাই। তারা তুলনা চায় না।"
তবে তিনি মনে করেন, কিছু পরিবর্তন হচ্ছে। অনেক নারী এখন কাজ খুঁজে স্বাধীন হতে চাইছে এবং "হোয়াইট ম্যারেজ" বা আনুষ্ঠানিক বিয়ে ছাড়া একসঙ্গে থাকার প্রবণতা বাড়ছে। "এখন এটা স্বাভাবিক," তিনি বলেন। "ইসলামি প্রজাতন্ত্র জানেও না। কেউ যাচাই করে না। মানুষ ব্যক্তিগক্ত স্বাধীনতা চায়।"
বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ
গত চার–পাঁচ বছর ধরে তিনি লেখা বন্ধ করে দিয়েছেন। "আমার ভাবনা আর ধারণাগুলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। আমি ইরানে নেই, তাই নতুন কিছু লিখতে পারি না। আমি ক্যালিফোর্নিয়ার গল্প লিখতে পারি না।"
বর্তমান বিক্ষোভ সম্পর্কে তিনি বলেন, "ইরানের নারীরা অনেক বদলে গেছে। অনেকেই এখন হিজাব ছাড়া বের হয়। তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্র কী ভাবছে তা নিয়ে ভাবেই না।" একটু থেমে তিনি বলেন— "ইরানের নারীরাই একদিন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটাবে।"



