ব্রিটিশ যুগ থেকে স্বাধীনতা: পূর্ব বাংলার রেল ইতিহাস ও গ্রিন অ্যারোর যাত্রা
পূর্ব বাংলার রেল ইতিহাস: গ্রিন অ্যারো থেকে স্বাধীনতা

ব্রিটিশ যুগে রেলপথের সূচনা ও পূর্ব বাংলার যোগাযোগ ব্যবস্থা

১৮৬২ সালে ব্রিটিশ শাসকরা চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে ৫৩.১১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি ট্রেন চালুর মাধ্যমে এই অঞ্চলে রেলওয়ের যাত্রা শুরু করেন। দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই রেলপথ কেবল যোগাযোগের মাধ্যমই ছিল না, বরং পূর্ব বাংলার অর্থনীতি, প্রশাসনিক কাঠামো এবং জনজীবনের একটি অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছিল। সাশ্রয়ী ভাড়া, তুলনামূলক দ্রুতগতি এবং নিরাপদ ভ্রমণের সুবিধার কারণে সে সময় রেলই ছিল সাধারণ মানুষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য যাতায়াতব্যবস্থা। তখনকার দিনে রেল দুর্ঘটনা ছিল অত্যন্ত বিরল ঘটনা, যা নৌপথের বিপরীতে একটি নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতো। নদীমাতৃক বাংলায় লঞ্চ ও স্টিমার দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটত, বিশেষ করে বর্ষা ও ঝড়ের মৌসুমে, যার ফলে বহু যাত্রী নৌপথের পরিবর্তে রেলপথে ভ্রমণকে বেশি নিরাপদ বলে মনে করতেন।

ভারত বিভাগ ও পাকিস্তান আমলে রেলওয়ের রূপান্তর

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং ভারত বিভাগের ফলে এই অঞ্চলের রেলওয়ে প্রশাসনিক বিভাজনের সম্মুখীন হয়। তৎকালীন ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে ও আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের একটি বড় অংশ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত পূর্ববঙ্গ অঞ্চলে পড়ে, যার মোট দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার। এই অংশটি নতুনভাবে সংগঠিত হয়ে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে নামে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতে থাকে। স্বাধীনতার পরবর্তী বছরগুলোয় রেলওয়ে ছিল পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান স্থল যোগাযোগ ব্যবস্থা, যা প্রশাসন, বাণিজ্য ও যাত্রী পরিবহনে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। ১৯৬১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের নাম পরিবর্তন করে পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ে রাখা হয় এবং পরের বছর এই রেলওয়ের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের হাতে ন্যস্ত করা হয়। ১৯৬২ সালের ৯ জুন জারিকৃত রাষ্ট্রপতির আদেশ অনুযায়ী, ১৯৬২-৬৩ অর্থবছর থেকে রেলওয়েটি পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়েজ বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হতে থাকে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গ্রিন অ্যারো ট্রেন: পূর্ব পাকিস্তানের আধুনিক রেলযাত্রার প্রতীক

পাকিস্তান আমলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে প্রথম দ্রুতগতির আন্তনগর ট্রেন হিসেবে গ্রিন অ্যারো চালু হয়, যা সময়নিষ্ঠ ভ্রমণের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। ১৯৫৫ সালের ১ মে তৎকালীন পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই আধুনিক ট্রেনের ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রথম শ্রেণির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচ ও স্বল্প সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর সক্ষমতার কারণে ট্রেনটি অল্প সময়েই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। গ্রিন অ্যারো শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ঢাকা-সিলেট লাইনেও চলাচল করত। ১৯৬১ সালের ইস্ট পাকিস্তান ট্রান্সপোর্টেশন সার্ভের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই দূরত্ব অতিক্রম করতে গ্রিন অ্যারো চট্টগ্রাম মেইলের তুলনায় প্রায় ১৫ মিনিট কম সময় নিত। তবে ১৯৬৪ সালে ফাতিমা জিন্নাহর সফরের সময় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যর্থনার কারণে এই ট্রেনের যাত্রা ব্যতিক্রমীভাবে দীর্ঘায়িত হয়, যা সাধারণত আট ঘণ্টার পথ প্রায় ৩০ ঘণ্টায় শেষ হয়েছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রেলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

গ্রিন অ্যারোর জনপ্রিয়তা এতটাই ব্যাপক ছিল যে সমকালীন সাহিত্যেও এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত কাজী নুরুন্নবীর উপন্যাস ‘মেঘমুক্ত আকাশ’-এ এই ট্রেনের একটি জীবন্ত বর্ণনা রয়েছে, যা তৎকালীন রেলভ্রমণ ও স্টেশন-সংস্কৃতির প্রাণবন্ত ছবি তুলে ধরে। এছাড়া, ১৯৭১ সালে প্রকাশিত এ কে এম ফজলুল হকের ‘ঝড়ের কবলে’ গ্রন্থে গ্রিন অ্যারোতে ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, যা ট্রেনের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গভীর সংযোগকে ফুটিয়ে তোলে। সরকারি নথিতেও গ্রিন অ্যারোর অবস্থান স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে, যেমন ইস্ট পাকিস্তান অ্যাসেম্বলি প্রসিডিংসে এই ট্রেনের দেরি ও সুবিধার অভাবের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

উল্কা এক্সপ্রেস ও অন্যান্য ট্রেনের যাত্রা

১৯৬৬ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চালু হয় প্রাতঃকালীন উল্কা এক্সপ্রেস, যা হালকা মেরুন রঙের এবং তখনকার মিটারগেজ লাইনের মধ্যে অন্যতম দ্রুতগামী ট্রেন হিসেবে পরিচিত ছিল। এই ট্রেনটি ভৈরববাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, কুমিল্লা, লাকসাম এবং ফেনীতে মাত্র ছয়টি সংক্ষিপ্ত স্টপেজে থামত। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী আপ উল্কা ৬ ঘণ্টা ২৫ মিনিটে এবং ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ডাউন উল্কা ৬ ঘণ্টা ৩০ মিনিটে চলাচল করত। ১৯৮৬ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে মহানগর এক্সপ্রেস চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উল্কা এক্সপ্রেস বন্ধ হয়ে যায়। পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ের ১৯৬৯ সালের টাইম টেবিল অনুযায়ী, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে উল্কা ও গ্রিন অ্যারোর পাশাপাশি চিটাগাং মেইল এবং ঢাকা ফাস্ট প্যাসেঞ্জার নামের আরও দুটি ট্রেন নিয়মিত চলাচল করত।

রেলের শ্রেণিবিভাগ ও যাত্রী সেবা

সেকালের রেলের বগিগুলো চার শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল—ফার্স্ট ক্লাস, সেকেন্ড ক্লাস, ইন্টার ক্লাস এবং থার্ড ক্লাস। সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এবং সমাজের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা ফার্স্ট ও সেকেন্ড ক্লাস বগিতে যাতায়াত করতেন। ইন্টার ক্লাস বগি ছিল সাধারণ চাকরিজীবী, শিক্ষক ও অন্যান্য পেশার সচ্ছল ব্যক্তিদের জন্য, আর বাকিরা যাতায়াত করতেন থার্ড ক্লাস বগিতে। ইন্টার ক্লাস এবং থার্ড ক্লাস বগিতে নারীদের জন্য আলাদা বগি থাকত, যার গায়ে লেখা থাকত ‘মহিলা’ এবং উর্দুতে ‘জেনানা’। প্রতিটি বগির ভেতরের দুই পাশের দেয়ালে লেখা থাকত বগির ধারণক্ষমতা, যেমন ‘১৪ জন বসিবেক’, ‘২৮ জন বসিবেক’ বা ‘৪০ জন বসিবেক’, যা যাত্রীদের জন্য একটি নির্দেশনা হিসেবে কাজ করত।

টিকিট বিক্রি ও যাত্রী সচেতনতা

টিকিট পেতে জনসাধারণ যেন অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তির মুখোমুখি না হয়, সে জন্য রেল কর্তৃপক্ষ পত্রিকায় নিয়মিত বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তাদের সচেতন করত। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে একটি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে প্রতিটি স্টেশনে যথেষ্ট সংখ্যক টিকিট প্রদত্ত হয়েছে এবং যদি কোনো স্টেশন থেকে টিকিট না দেওয়া হয়, তবে চট্টগ্রামস্থ চিফ ট্রাফিক ম্যানেজারের নিকট অবিলম্বে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছিল। তবে এই বিজ্ঞপ্তি সত্ত্বেও ভোগান্তি পুরোপুরি কমত না, এবং সমকালীন পত্রিকায় অসংখ্য অভিযোগ প্রকাশ পেত। কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞাপনের ভাষা ক্রমে কঠোর ও উদ্ভাবনী করত, এমনকি জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করত।

অ্যালার্ম চেইন ও সামাজিক শৃঙ্খলা

রেলের অ্যালার্ম চেইন টানা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রায়ই বিড়ম্বনায় পড়তে হতো, তাই যাত্রীদের সতর্ক করার জন্য নিয়মিতভাবে বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হতো। ১৯৭০ সালের ৪ জানুয়ারি দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে অযথা এলার্ম চেইন টানার ফলে সৃষ্ট সমস্যাগুলো বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছিল, যেমন রোগীদের ঔষধ ও ডাক্তারের নাগালের অভাব, ছাত্রদের ক্লাস হারানো এবং কর্মচারীদের অফিস পৌঁছাতে না পারা। অন্যদিকে, ১৯৭০ সালের ৪ এপ্রিল আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত সতর্কবার্তায় শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, এবং কেবল জরুরি প্রয়োজনেই এই ব্যবস্থা ব্যবহার করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছিল।

বিশেষ উপলক্ষে রেল পরিষেবা

বিশেষ উপলক্ষকে কেন্দ্র করে রেল কর্তৃপক্ষ প্রায়ই অতিরিক্ত ট্রেন চালু করত এবং ভ্রমণের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করত। ১৯৬২ সালের ১৮ জানুয়ারি দ্য ইস্টার্ন এক্সামিনার পত্রিকায় প্রকাশিত পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ের একটি বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায় যে, ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য ক্রিকেট টেস্ট ম্যাচ দেখার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত একটি বিশেষ ট্রেন চালানো হবে, এবং ম্যাচ শেষ হওয়ার দিন ফেরত যাত্রীদের জন্য আরেকটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হবে। এই উদ্যোগগুলি রেল কর্তৃপক্ষের জনজীবনের স্পন্দনের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রাখার চেষ্টাকে প্রতিফলিত করে।

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ রেলওয়ে

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ের অবসান ঘটে এবং নতুন রাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী রেলওয়েকে পুনর্গঠন করা হয়। স্বাধীনতার পর এই রেলওয়ে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে’ নামে আত্মপ্রকাশ করে এবং আগের অবকাঠামো নিয়েই নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে। ১৬৪ বছর ধরে রেলপথ পূর্ব বাংলার মানুষের চলাচলের মাধ্যম হওয়ার পাশাপাশি তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ-উচ্ছ্বাস, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধেরও এক গুরুত্বপূর্ণ বাহক হিসেবে কাজ করেছে। এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই পরবর্তীকালে বাংলাদেশ রেলওয়ে তার বর্তমান পরিচয়ে পৌঁছেছে, যার ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল ঔপনিবেশিক যুগে, বিকশিত হয়েছিল পাকিস্তান আমলে এবং নতুন রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে নতুন অর্থে আত্মপ্রকাশ করেছিল।