ঈদযাত্রায় সদরঘাটে ভোগান্তি: লঞ্চে জায়গা না পেয়ে হাজারো যাত্রী
ঈদযাত্রায় সদরঘাটে ভোগান্তি, লঞ্চে জায়গা নেই

ঈদযাত্রায় সদরঘাটে ভোগান্তির চিত্র

ঈদ উৎসব সামনে রেখে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে বাড়ি ফেরার তাগিদে হাজারো মানুষ ভিড় জমিয়েছেন রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। গতকাল বুধবার সকাল থেকেই শুরু হওয়া এই ভিড়ে লঞ্চে জায়গা না পেয়ে অনেকে পড়েছেন অনিশ্চয়তার মধ্যে। স্বস্তির যাত্রা বদলে গেছে ভোগান্তির এক দীর্ঘ পর্বে।

লঞ্চে উঠতে হিমশিম অবস্থা

সদরঘাটের পন্টুন থেকে ক্রমাগত ভেসে আসছিল বিভিন্ন গন্তব্যের নাম ধরে হাঁকডাক। ‘দেউলা, দেবীরচর, লালমোহন’, ‘বগা, পটুয়াখালী, কালাইয়া’—এমনই শব্দে মুখর ছিল পুরো এলাকা। সামনে সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা দোতলা-তিনতলা লঞ্চগুলোর কোনোটি দুপুরে, কোনোটি সন্ধ্যায়, আবার কোনোটির রাতে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও দুপুর গড়াতেই অধিকাংশ লঞ্চ প্রায় যাত্রীতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

সুন্দরবন-১৪ লঞ্চের কথা ছিল বেলা দুইটায় ঢাকা থেকে পটুয়াখালীর উদ্দেশে রওনা দেওয়ার, কিন্তু তিনটার সময়ও লঞ্চের বাইরে হাঁকডাক চলছিল অবিরাম। হাতে, কাঁধে, মাথায় ব্যাগ ও বস্তায় মালামাল নিয়ে অনেকেই লঞ্চে উঠছিলেন, আবার জায়গা না পেয়ে নেমেও আসছিলেন। পন্টুনের এক কোণে ব্যাগের ওপর বসে থাকা শরিফুল আলম বলেন, ‘পটুয়াখালী যাব, কিন্তু লঞ্চে সিট মেলেনি। কর্মীরা বলছে আরেকটা লঞ্চ আসবে, তাই অপেক্ষা করছি।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যাত্রীদের দুর্ভোগ ও হতাশা

একই লঞ্চের ছাদে জায়গা পাওয়া মিলন নামের এক যাত্রী জানান, জায়গা পেতে তাঁকে সকাল ছয়টায়ই আসতে হয়েছে। অনেকে আগের দিন রাত থেকেই এসে জায়গা দখল করে রেখেছিলেন। লঞ্চের কর্মীরা অতিরিক্ত যাত্রীদের জন্য জায়গা করতে গিয়ে আগে থেকে বসে থাকাদেরও সরিয়ে দিচ্ছিলেন।

শরিফুল ও মিলনের মতোই ঈদে বাড়ি ফিরতে গতকাল সকাল থেকেই সদরঘাটে ভিড় করেছিলেন হাজার হাজার মানুষ। তাঁদের বেশির ভাগই ডেক এবং সোফার যাত্রী। কেউ আগেভাগে এসে সিট নিশ্চিত করতে পেরেছেন, আর কেউ দেরি করে আসায় যাত্রা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। সব মিলিয়ে এই যাত্রা পদে পদে হয়ে উঠেছে ভোগান্তির।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যানজট ও কর্মীদের বিরক্তি

ঈদযাত্রায় ভোগান্তির সূচনা হয়েছিল রাজধানীর পুরান ঢাকার বাংলাবাজার মোড় থেকে। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা যাত্রী ও যানবাহনের কারণে সেখানে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ফলে অনেক যাত্রীকেই ভারী মালামাল নিয়ে নেমে হেঁটে সদরঘাটের দিকে যেতে দেখা গিয়েছিল। এক যাত্রী বলেন, ‘দেরি করলে লঞ্চে জায়গা পাব না, তাই বাধ্য হয়ে হাঁটছি।’

বাংলাবাজার মোড় পেরিয়ে সদরঘাটের মূল ফটকের সামনেও ছিল মানুষের ভিড়। সবাই ছুটছিলেন পন্টুনে থাকা লঞ্চগুলোর দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি লঞ্চের সামনেই যাত্রীদের চাপ। কেউ একা, কেউ পরিবারসহ, প্রায় সবার হাতেই মালামাল। বেশ কয়েকজন যাত্রীকে মোটরবাইক নিয়েও লঞ্চে উঠতে দেখা গেল।

১০ নম্বর পন্টুনে দাঁড়িয়ে থাকা এম ভি ইয়াদ-৩ লঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে কর্মী যাত্রীদের ডাকছিলেন। কখন ছাড়বে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, ‘ভরলেই ছাড়ব’। তবে লঞ্চের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখা গেল, ডেকে প্রায় জায়গা নেই বললেই চলে। সামনের অংশেও মালামালসহ শুয়ে-বসে ছিল মানুষ। ভরতে আর কতজন লাগবে জানতে চাইলে তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘কাজের সময় বিরক্ত কইরেন না।’

বরগুনা, ভোলা ও পটুয়াখালী রুটে চাপ বেশি

সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গিয়েছিল বরগুনা, ভোলা ও পটুয়াখালী রুটের লঞ্চগুলোর সামনে। এসব রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলো থেকে মালামাল নিয়ে অনেক যাত্রীকেই নেমে আসতে দেখা গিয়েছিল। তাঁরা জানান, লঞ্চে জায়গা পাননি। কেউ বললেন, পরবর্তী লঞ্চের জন্য অপেক্ষা করবেন, আবার কেউ কাছাকাছি গন্তব্যের লঞ্চের খোঁজে চলে গেলেন।

সদরঘাট থেকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২০টির বেশি জেলার লঞ্চ ছেড়ে যায়। তবে ঢাকা থেকে বরিশাল রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলো আকারে বেশ বড় এবং জাঁকজমকপূর্ণ। এসব লঞ্চের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বেশির ভাগই ছাড়বে রাতে। কেবিনগুলো আগে থেকেই বুক হয়ে আছে, অন্য সিটগুলোর জন্য যাত্রীরা ভিড় করছেন। ঢাকা থেকে বরিশাল ডেকের ভাড়া ৩৫০ টাকা রাখা হচ্ছে, আর সোফাযুক্ত লঞ্চগুলোর ভাড়া ৫০০ টাকা।

সেখানে ভিড় কিছুটা কম থাকলেও যাত্রীর চাপ ছিল। বরিশালগামী এম এন খান-৭ লঞ্চ থেকে মালামালসহ দুই শিশুকে নিয়ে নেমে আসতে দেখা গেল একজন নারীকে। তাঁর অভিযোগ, ডেকে জায়গা ফাঁকা থাকার পরও লঞ্চের কর্মীরা ছাদে যাওয়ার জন্য বলছেন। তিনি বলেন, ‘নিচের জায়গাগুলো রেখে দিচ্ছে পরে বেশি টাকায় বিক্রি করার জন্য। আমি আগে এসেছি, আমি ছাদে যাব কেন।’

এম এন খান-৭–এ গিয়ে দেখা গেল, নিচতলার ডেকে অনেকটা জায়গা মোটা দড়ি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। সেখানে কোনো যাত্রীকে বসতে দেওয়া হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে লঞ্চটির কেবিন ইনচার্জ কামরুল দাবি করেন, ভিড় এড়াতেই যাত্রীদের আগে ওপরে যেতে বলা হচ্ছে।

হকারদের উপস্থিতি ও শেষ মুহূর্তের হুড়োহুড়ি

যাত্রীদের ভিড়কে কেন্দ্র করে হকারদের চাপও ছিল পন্টুনে। অনেকেই ইফতার আয়োজন নিয়ে বসেছিলেন। কেউ বিক্রি করছিলেন ফল, কেউ রুটি, চপ, পেঁয়াজুও। পানি বিক্রি হচ্ছিল দুই ধরনের; ‘ইনটেক’ এবং ‘নরমাল’। এক বিক্রেতা নারী জানান, ‘একটা কোম্পানির পানি আরেকটা ফিল্টার থেকে ভরা।’

বিকেল চারটার দিকে ভোলাগামী এমভি শতাব্দী বাঁধন ছাড়ার ঘোষণা আসতেই ১০ নম্বর পন্টুনে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। যে যেখানে ছিলেন, সেখান থেকেই দৌড়ে লঞ্চ ধরার চেষ্টা করেন। মালামাল হাতে, শিশু কোলে নিয়ে অনেকে শেষ মুহূর্তে ওঠার চেষ্টা করেন, কিন্তু ভিড়ের চাপে বেশির ভাগই উঠতে পারেননি।

লঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার পরও ঘাটে অপেক্ষমাণ ছিলেন অসংখ্য যাত্রী। কারও চোখে উদ্বেগ, কারও কণ্ঠে বিরক্তি। তখনই মাইকে ভেসে আসে ‘সকল রুটে পর্যাপ্ত লঞ্চ রয়েছে, কেউ তাড়াহুড়ো করবেন না’। তবে তাতে খুব একটা আশ্বস্ত মনে হয়নি তাঁদের। কোলে শিশুসন্তান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মো. রুবেল বলেন, ‘এতক্ষণ ধরে চেষ্টা করেও লঞ্চে উঠতে পারলাম না। সারা দিনের ভোগান্তি বৃথা গেল।’