প্রশান্ত মহাসাগরের জলদস্যু দ্বীপে এক রোমাঞ্চকর যাত্রা
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান পেদ্রো উপকূল থেকে আমাদের জাহাজটি যাত্রা শুরু করল প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ বরাবর। বন্দর ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজটি পূর্ণ গতিতে ছুটতে লাগল, আর পেছনে তীরের শেষ চিহ্নটুকুও মিলিয়ে গেল ধীরে ধীরে। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে দূর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ ভেতরের শোরগোলে মনোযোগ নষ্ট হয়ে গেল। রেলিংয়ের দিকে সবাই এক এক করে সরে যাচ্ছে দেখে কৌতূহলী হয়ে সেদিকে এগিয়ে গেলাম।
ডলফিনের পাল্লা ও এক প্রবীণ দম্পতির সৌজন্য
ভিড় ঠেলে সামনে যেতে না পেরে হতাশ হচ্ছিলাম, তখন এক প্রবীণ দম্পতি নিজেদের জায়গাটুকু ছেড়ে দিয়ে আমাকে ডাকলেন। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নিচে তাকাতেই চোখে পড়ল এক বিস্ময়কর দৃশ্য। একঝাঁক ডলফিন জাহাজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তীব্র গতিতে ছুটছে, মনে হচ্ছিল এই বুঝি জাহাজের খোলে ধাক্কা খাবে ওরা। দীর্ঘক্ষণ ঝুঁকে থেকে সেই দৃশ্য উপভোগ করার পর প্রবীণ দম্পতিকে জায়গা ফেরত দিতে চাইতেই তারা হাত দিয়ে আশ্বস্ত করার ভঙ্গি করলেন। আলাপ জমাতে নিজে থেকেই তারা পরিচয় পর্ব সেরে নিলেন। মার্সেল নামের সেই ভদ্রলোক ও তাঁর স্ত্রী ক্লোয়ির সঙ্গে কথোপকথন শুরু হলো।
বাংলাদেশি বন্ধু নাঈমের সঙ্গে পরিচয়
আমার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বন্ধু নাঈমকে মার্সেল-ক্লোয়ির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য তাকে খুঁজতে বের হলাম। পিরোজপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রাক্তন এই ছাত্র এখন পুরোদস্তুর মার্কিন নাগরিক, যার মুখে পুরু সানস্ক্রিন মেখে জাহাজের ডেকে আধশোয়া অবস্থায় পাওয়া গেল। তাকে ডেকে নিয়ে মার্সেল-ক্লোয়ির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম। আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি জানালে মার্সেল বিস্ময় চেপে না রেখে বললেন, ‘পৃথিবীর ঠিক অপর প্রান্ত থেকে চলে এসেছ যে!’
অ্যাভালন দ্বীপে পদার্পণ
একসময় জাহাজের গতি কমে এল, আর দূরে দেখা গেল পাহাড়ের মতো এক অবয়ব। ধীরে ধীরে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে ঠাসবুনোট বনের এক দ্বীপ ভেসে উঠল। আরও কাছে গেলে চোখে পড়ল সারি সারি সেইল বোট আর সাদা ইয়ট নোঙর করে রাখা। মার্সেল জানালেন, ‘দ্বীপের এই শহরের নাম অ্যাভালন। পুরোটা ঘুরে দেখো, ভালো লাগবে। প্রাচীনকালে জলদস্যুরা এ দ্বীপে গুপ্তধন লুকাতে আসত, লোকে এখনো গুপ্তধনের খোঁজে এখানে আসে।’ এই কথায় নাঈমের চোখে-মুখে প্রথমবারের মতো আগ্রহ দেখা গেল, আর সে ব্যাকপ্যাক নিয়ে জাহাজ থেকে নামার জন্য তাড়া দিতে লাগল।
তীরের শহরে স্বাদু অভিজ্ঞতা
তীর ধরে শহরের প্রান্তে এসে হাজির হওয়ার পর নোনা হাওয়া আর আশপাশের সি ফুডের কড়া ঘ্রাণে ক্ষুধা তীব্র হতে থাকল। একটি ছোটখাটো সাজানো-গোছানো রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়লাম আমরা। ফিশ টাকোস দিয়ে খাওয়া শুরু হলো, নরম টরটিলার ভেতরে লেবুর রস মেশানো গ্রিল করা তাজা মাছ আর মেক্সিকান সসের পরত মাখানো খাবারগুলো মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল। তারপর এল ভুট্টার আটা দিয়ে বানানো কড়কড়ে নাচোস আর অ্যাভোকাডো দিয়ে বানানো নরম ডিপ। শেষে গ্রিলড ফিশ দেওয়া সিজার সালাদ খেয়ে মনে হলো এবার শেষ করা যাক, যদিও নাঈমের প্লেটের ভাজা মাছ আর গরম ফ্রাই তখনো শেষ হয়নি।
পাহাড়ি ট্রেইলে অ্যাডভেঞ্চার
রেস্তোরাঁ ম্যানেজারের পরামর্শে আমরা পাহাড়ি ট্রেইল ধরে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিলাম। নাঈমকে তাড়া দিতেই সে একটা লেমোনেড হাতে নিয়ে হেলতে-দুলতে বের হলো। বুনো পথ ধরে হাঁটতে শুরু করলে তাজা বাতাস আর জলদস্যু দ্বীপে অ্যাডভেঞ্চারের উত্তেজনায় ঘুম কোথায় যেন উড়ে গেল। পাহাড়ের গায়ে ছায়া লম্বা হয়ে নামতে শুরু করায় আমরা শহরটি পেছনে ফেলে পাহাড়ি ট্রেইল ধরে ওপরে উঠতে লাগলাম। পাথুরে পথের দুই পাশে ঘন ঝোপঝাড় আর অপরিচিত ক্যাকটাসে ফুটে থাকা ফুল আমাদের মুগ্ধ করল। খোলা জায়গায় এলে নিচে নীল সমুদ্র আর দূরে সাদা খেলনার মতো ভাসতে থাকা সেইল বোটগুলো দেখা গেল।
জলদস্যুদের প্রিয় এই দ্বীপের রহস্য
আরও ওপরে উঠতেই পাহাড়ের ঢালে কয়েকটা হরিণ চড়তে দেখলাম, যারা মানুষের কাছাকাছি এসেও ভয় পেল না। এখান থেকে খোলা সমুদ্র বহুদূর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাওয়ায় জলদস্যুরা কেন এ দ্বীপ এত পছন্দ করত, তা বোঝা গেল। অনেক উঁচু থেকে সমুদ্রের সব পথ দেখা যাওয়ায় শত্রু জাহাজ এলে আগেভাগেই টের পেয়ে যেত তারা। এ ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার এই উপকূলে ১৬ থেকে ১৮ শতকে প্রচুর স্প্যানিশ গ্যালিয়ন জাহাজ চলাচল করত, ধনসম্পদে ভর্তি এসব জাহাজে হামলার জন্য জলদস্যুদের কাছে এ দ্বীপটি ছিল ভারি পছন্দের।
গুহামুখ ও না জানা গুপ্তধনের সন্ধান
পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে এক জোড়া পেরেগ্রিন ফ্যালকনকে ডানা মেলে চক্কর দিতে দেখে নাঈম বলল, ‘এসব পাখি পাহাড়ের কিনারায় বাসা বানায়, চল খুঁজে দেখি।’ বলে সে ট্রেইল ছেড়ে জঙ্গলের পথ ধরল। তাকে থামানো গেল না, তাই পা পিছলে নিচে পড়ার ভয় থাকা সত্ত্বেও তার পিছু নিতে হলো। পাখির বাসা খুঁজে না পেলেও আমরা পাহাড়ের খাড়িতে অনেক গুহামুখ খুঁজে পেলাম, যেগুলোর মধ্যে কোনটা প্রাকৃতিক আর কোনটা লুকিয়ে থাকার জন্য বানানো হয়েছিল, তা এখন আর বোঝা যায় না।
সন্ধ্যা নামতে শুরু করায় কেমন যেন ঠান্ডা আর গা শিরশিরে অনুভূতি হতে লাগল। মনে হচ্ছিল জলদস্যু কিংবা ঝড়ে হারিয়ে যাওয়া কোনো নাবিক হয়তো এখানে থেকেছে, কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে তাদের নাম আর নিশানা। শুধু টিকে আছে এই দ্বীপটি, সহস্র রহস্য আর না জানা কোনো গুপ্তধন বুকে নিয়ে। এই অভিজ্ঞতা শুধু একটি ভ্রমণ কাহিনী নয়, বরং ইতিহাস ও প্রকৃতির মেলবন্ধনে এক অনবদ্য স্মৃতি।



