ঈদ জামাতে বিশ্ব শান্তির প্রার্থনা, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রতিফলন
পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন শনিবার সকালে রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহে প্রধান ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এই জামাতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেন, প্রায় সাড়ে তিন দশক পর একসঙ্গে তাঁদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আবদুল মালেক। নামাজ শেষে মোনাজাতে তিনি দেশের শান্তি-সমৃদ্ধি কামনার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী ফিতনা-ফ্যাসাদ ও যুদ্ধ বন্ধের প্রার্থনা জানান, যা হাজারো মুসল্লির ‘আমিন’ ধ্বনিতে প্রতিধ্বনিত হয়।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব ও বাংলাদেশের উদ্বেগ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে আক্রমণের মাধ্যমে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন বিশ্বব্যাপী সংকট সৃষ্টি করেছে। এই যুদ্ধের আঁচ বাংলাদেশেও লেগেছে, যার প্রতিফলন দেখা গেছে ঈদের নামাজে। জাতীয় ঈদগাহে এক ব্যক্তি যুদ্ধ বন্ধের আহ্বানসংবলিত প্ল্যাকার্ড তুলে ধরেন, যা সংকটের তীব্রতা নির্দেশ করে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাসসমৃদ্ধ অঞ্চলের এই সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলেছে, বাংলাদেশেও জ্বালানি তেল রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কোটি কোটি মানুষের ঈদ উৎসব এবার ম্লান হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই সংকট বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি রেমিট্যান্সের বেশির ভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। ইতিমধ্যে যুদ্ধপীড়িত অঞ্চলে অন্তত পাঁচজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, এবং দেড় শতাধিক বাংলাদেশিকে ইরান থেকে উদ্ধার করে আনা হয়েছে। প্রবাসী আয় হ্রাসের শঙ্কা ও জ্বালানি সংকট দেশের অর্থনীতিকে চাপের মুখে ফেলতে পারে।
ঈদ উদযাপন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
শাওয়ালের চাঁদ দেখার ভিত্তিতে বাংলাদেশে এবার ঈদুল ফিতর শনিবার পালিত হয়। সকাল সাড়ে আটটায় জাতীয় ঈদগাহে অনুষ্ঠিত প্রধান জামাতে হাজারো মুসল্লি অংশ নেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, মূল প্যান্ডেলে প্রায় ৩৫ হাজার মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়, এবং আশপাশের সড়ক ও খোলা জায়গা মিলিয়ে মোট ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ মুসল্লির সুযোগ ছিল। নারীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থাও করা হয়।
ঈদের দিন ঝড়বৃষ্টির আভাস থাকলেও সকালে মেঘলা আকাশে জামাত নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। মুসল্লিরা আর্চওয়ে ও মেটাল ডিটেক্টরের তল্লাশির মধ্য দিয়ে প্রবেশ করেন, এবং জায়গা না পেয়ে অনেকে রাস্তায় নামাজ আদায় করেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পাশাপাশি বসে নামাজ আদায় করেন এবং পরে কোলাকুলি ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা ও কূটনীতিকরাও জামাতে উপস্থিত ছিলেন।
নেতাদের বাণী ও ঐক্যের বার্তা
ঈদ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর বাণীতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়ার কথা উল্লেখ করেন, এবং সরকারের মোকাবিলা প্রচেষ্টার কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় ঐক্য, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতা সুদৃঢ় করার আশা প্রকাশ করেন। ইমাম মুফতি আবদুল মালেক মোনাজাতে অসহায় মুসলমানদের পাশে দাঁড়াতে সব মুসলিম দেশের প্রতি আহ্বান জানান, এবং জালিমদের বিরুদ্ধে দোয়া করেন।
এই ঈদে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ছায়া স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে, যা ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও বিশ্ব শান্তির আকুতি তুলে ধরেছে। বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে ঈদ উদযাপন ঐক্যবদ্ধতার পরিচয় দিয়েছে, কিন্তু চলমান যুদ্ধের সম্ভাব্য প্রভাব দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেন।



