বরগুনায় সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ২০ হাজার মানুষের আগাম ঈদ উদযাপন
প্রতিবছরের ধারাবাহিকতায় এবারও সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে বরগুনার বিভিন্ন গ্রামে আগাম পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করেছেন প্রায় ২০ হাজার মানুষ। শুক্রবার (২০ মার্চ) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বেতাগী উপজেলার কাজিরাবাদ ইউনিয়নের মধ্য বকুলতলী গ্রামের মল্লিক বাড়ি জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত ঈদের জামাতে বরগুনা সদর ও বেতাগী উপজেলার বিভিন্ন বয়সি শতাধিক মুসল্লি অংশ নেন।
ঐতিহাসিক প্রথার সূচনা ও বিস্তার
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২০০ বছর আগে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া এলাকার মির্জাখিল দরবার শরীফের অনুসারী চান মিয়া ও কাশেম মৌলভীর মাধ্যমে এ অঞ্চলে এই প্রথার সূচনা হয়। সেই থেকে বরগুনা সদর উপজেলার পাজরাভাঙ্গা, লাকুরতলা, গৌরীচন্না; বেতাগী উপজেলার লক্ষ্মীপুরা, কাজিরাবাদ, বকুলতলী; বামনা উপজেলার ছোনবুনিয়া; আমতলীর গোজখালী এবং তালতলীর নিদ্রা, আলিরবন্দর, নিউপাড়াসহ বিভিন্ন গ্রামে একইভাবে ঈদ উদযাপিত হয়। এসব এলাকার সহস্রাধিক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে রোজা ও ঈদ উদযাপন করে আসছেন।
ঈদের দিনের চিত্র ও স্থানীয়দের বক্তব্য
সরজমিনে বেতাগী উপজেলার বকুলতলী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সাধারণ ঈদের মতোই নতুন পোশাক পড়ে মল্লিক বাড়ির ঈদগাহ ময়দানে আসছেন বিভিন্ন বয়সি মানুষ। এর মধ্যে অধিকাংশই বয়োবৃদ্ধ। মাঠে এসে কেউ কোলাকুলি করছেন, কেউ বা করছেন কুশল বিনিময়। নামাজ শেষে হযরত কাদেরিয়া চিশতিয়া তরিকার খানকায় কবর জিয়ারত করে বিভিন্ন বাসা বাড়িতে চলছে ঈদের ফিন্নি পায়েস দিয়ে আপ্যায়ন। একই অবস্থা বরগুনার অন্তত ১৫টি গ্রামে।
ঈদের নামাজ পড়তে আসা সাত বছরের রায়হান মল্লিক বলেন, "আমার সব বন্ধুরা একদিন পর ঈদ পালন করে। আর আমি তাদের একদিন আগেই নতুন জামা পরে ঈদ পালন করি। এতে আমার অনেক খুশি হয়। আমার বাবা আমাকে প্রতি ঈদে নামাজ পড়তে নিয়ে আসে।"
মধ্য বকুলতলী গ্রামের সত্তরোর্ধ বাসিন্দা আব্দুল গণী মল্লিক বলেন, "প্রায় ২০০ বছর আগে আমাদের এলাকার বাসিন্দারা সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদুল ফিতর উদযাপন করেন। শুধু তাই নয়, একইভাবে এখানকার বাসিন্দারা ঈদুল আযহাও উদযাপন করেন। মূলত, ধর্মীয় সকল রীতি-রেওয়াজ, নিয়ম-কানুন সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখেই এখানে পালন করা হয়।"
ধর্মীয় নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গি
বরগুনা থেকে ঈদের নামাজে অংশগ্রহণ করতে যাওয়া ফজলুল হক বলেন, "প্রায় ২০০ বছর আগে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া এলাকার মির্জাখিল দরবার শরীফের নির্দেশে চান মিয়া ও কাশেম মৌলভী সাহেব এই এলাকায় এসে এমন ধর্মীয় নিয়ম-কানুন, রীতি-রেওয়াজ প্রচলন করেন। সেই থেকেই আমাদের পূর্বপুরুষ সহ আমরা সৌদির সঙ্গে মিল রেখেই রোজা এবং ঈদ পালন করছি। বরগুনা জেলায় আমাদের অন্তত ২০ হাজার অনুসারীসহ সারা দেশে একইভাবে পালন করে আসছে।"
এ বিষয়ে ঈদ জামাতের ইমাম মো. ফজলুর রহমান বলেন, "চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থেকেই আমাদের এখানে এমন ধর্মীয় রীতি চালু হয়েছে। সুদীর্ঘ বছর ধরে আমরা এভাবেই ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করে আসছি। আগে আমাদের লোক সংখ্যা বেশি থাকলেও বর্তমানে কিছুটা কমেছে।"
এছাড়াও আমতলী ও তালতলী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে সৌদির সঙ্গে মিল রেখে রোজা পালন শেষে শুক্রবার সকালে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এই ঐতিহ্যবাহী প্রথা বরগুনার গ্রামীণ সমাজে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে টিকে আছে।



