এক ফোঁটা চোখের পানির মূল্য: তওবার অশ্রু জাহান্নাম নিভায়
এক ফোঁটা চোখের পানির মূল্য: তওবার অশ্রু জাহান্নাম নিভায়

মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন হৃদয় ভেঙে যায়, আত্মা কেঁপে ওঠে এবং চোখের কোণে জমে ওঠে অনুতাপের অশ্রু। এই অশ্রু কখনো দুঃখের, কখনো ভালোবাসার, আবার কখনো রবের দরবারে ফিরে আসার আকুতির ভাষা হয়ে ওঠে। পৃথিবীর চোখে হয়তো একটি অশ্রুবিন্দুর কোনো মূল্য নেই, কিন্তু আল্লাহর কাছে বান্দার তওবার অশ্রু অত্যন্ত মহামূল্যবান।

এক ফোঁটা চোখের পানির মূল্য কত?

প্রশ্ন করা হয়েছিল—‘এক ফোঁটা চোখের পানির ওজন কতটুকু?’ উত্তরে বলা হয়—‘সাত সমুদ্রের পানিও যে আগুন নেভাতে পারে না; তওবার নিয়তে গড়িয়ে পড়া বান্দার এক ফোঁটা চোখের পানি জাহান্নামের আগুনও নিভিয়ে দিতে সক্ষম।’ যদিও এই কথাটি হুবহু কোনো হাদিস নয়, তবে এর অর্থ কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে গভীর সত্য বহন করে। কারণ আল্লাহ তাআলা সেই অন্তরকে ভালোবাসেন, যে অন্তর গুনাহের ভয় ও আল্লাহর ভালোবাসায় কেঁদে ওঠে।

আল্লাহভীতির অশ্রু কেন এত মূল্যবান?

মানুষের চোখের অশ্রু তখনই মূল্যবান হয়ে ওঠে, যখন তা হয় আল্লাহর ভয়, গুনাহের অনুতাপ কিংবা তার ভালোবাসা থেকে উৎসারিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—عَيْنَانِ لَا تَمَسُّهُمَا النَّارُ: عَيْنٌ بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ، وَعَيْنٌ بَاتَتْ تَحْرُسُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ অর্থ: ‘দুটি চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না—এক. যে চোখ আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে। দুই. যে চোখ আল্লাহর পথে প্রহরায় রাত কাটিয়েছে।’ (তিরমিজি ১৬৩৯) এই হাদিস স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়—আল্লাহর ভয়ে ঝরে পড়া অশ্রু কেবল আবেগ নয়; বরং তা জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণও হতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তওবার কান্না আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়

মানুষ ভুল করবে— এটাই মানবস্বভাব। কিন্তু প্রকৃত মুমিন সে, যে ভুলের পর আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন—قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا অর্থ: ‘বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা আয-যুমার: আয়াত ৫৩) যখন কোনো বান্দা গভীর অনুতাপে কেঁদে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, তখন সেই অশ্রু আল্লাহর রহমত ডেকে আনে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—لَلَّهُ أَفْرَحُ بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ مِنْ أَحَدِكُمْ سَقَطَ عَلَى بَعِيرِهِ وَقَدْ أَضَلَّهُ فِي أَرْضِ فَلَاةٍ অর্থ: ‘আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবায় এত বেশি আনন্দিত হন, যেমন তোমাদের কেউ মরুভূমিতে হারানো উট ফিরে পেয়ে আনন্দিত হয়।’ (মুসলিম ২৭৪৭)

যে অন্তর কাঁদে না, তা কি কঠিন হয়ে যায়?

কুরআনে আল্লাহ তাআলা এমন অন্তরের কথা বলেছেন, যা দীর্ঘদিন গুনাহে নিমজ্জিত থাকার কারণে কঠিন হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন—ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُم مِّن بَعْدِ ذَٰلِكَ فَهِيَ كَالْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةً অর্থ: ‘এরপর তোমাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেল; তা পাথরের মতো, বরং তার চেয়েও কঠিন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ৭৪) যে হৃদয় আল্লাহর স্মরণে নরম হয়, গুনাহের জন্য কাঁদে এবং তওবায় ভিজে যায়— সেই হৃদয়ই জীবন্ত হৃদয়।

রাতের নির্জনতায় অশ্রু ঝরানো বান্দার মর্যাদা

রাসুলুল্লাহ (সা.) সাত শ্রেণির মানুষের কথা বলেছেন, যারা কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে আল্লাহর আরশের ছায়া লাভ করবে। তাদের একজন হলো—وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ অর্থ: ‘সে ব্যক্তি, যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করেছে, ফলে তার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়েছে।’ (বুখারি ৬৬০) এ অশ্রু লোক দেখানোর নয়; এটি অন্তরের গভীরতম ভালোবাসা ও ভয় থেকে উৎসারিত।

কীভাবে অন্তরকে নরম করা যায়?

  • নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করা
  • গুনাহের কথা স্মরণ করে তওবা করা
  • কবর ও আখিরাতের কথা বেশি বেশি চিন্তা করা
  • নির্জনে আল্লাহর কাছে দোয়া করা
  • তাহাজ্জুদে কান্নার চেষ্টা করা
  • আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্মরণ করা

তওবার দোয়া

رَبِّ اغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ উচ্চারণ: ‘রাব্বিগফিরলি ওয়া তুব আলাইয়্যা ইন্নাকা আংতাত তাওয়্যাবুর রাহিম।’ অর্থ: ‘হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার তওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’ (আবু দাউদ ১৫১৬)

দুনিয়ার চোখে একটি অশ্রুবিন্দু হয়তো তুচ্ছ; কিন্তু আল্লাহর দরবারে তওবার অশ্রু পাহাড়সম গুনাহকেও মুছে দিতে পারে। যে চোখ আল্লাহর ভয়ে ভিজে যায়, সেই চোখ জাহান্নামের আগুন থেকে নিরাপত্তার সুসংবাদ পায়। তাই আসুন, আমরা এমন অন্তর গড়ে তুলি, যা গুনাহে কঠিন হয়ে যায় না; বরং আল্লাহর স্মরণে নরম হয়ে আসে। এমন চোখের মালিক হই, যা মানুষের সামনে নয়— রাতের নির্জনতায় রবের দরবারে অশ্রু ঝরায়। আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরকে নরম করুন, তওবার অশ্রু দান করুন এবং সেই সৌভাগ্যবান বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যাদের চোখ জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। আমিন।