পত্রপুটের পুনর্পাঠ: যুদ্ধের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের মানবিক বার্তা
পত্রপুটের পুনর্পাঠ: রবীন্দ্রনাথের মানবিক বার্তা

আমাদের চেনা পৃথিবী পাল্টে যাচ্ছে দ্রুত, নানাভাবে নানাদিকে। এই পরিবর্তনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিচারে সভ্যতার অগ্রগতি বিস্ময়কর, তবে মানবিক বিশ্ব গড়ার প্রশ্নে তা হতবুদ্ধিকর। পরিস্থিতিদৃষ্টে মনে হয়, বিশ্বসমাজ শান্তিতে বসবাসের রীতি বিস্মৃত হয়ে আত্মহননে মেতে উঠছে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর শান্তির উদ্যোগ

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ভয়ংকরতা শেষে মানবসমাজ অনেক ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল—ভবিষ্যৎ যুদ্ধ ও ধ্বংসের রাশ টেনে ধরতে। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে দেশে সংঘাতের মাত্রা কমিয়ে আনা এবং যুদ্ধ পরিহারের জন্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিমালা প্রণয়ন ও অনুসরণের পদ্ধতি গৃহীত হয়েছিল। মানবিক বিশ্ব গড়বার প্রতিশ্রুতি সর্বজনীন স্বীকৃতি অর্জন করেছিল। তারপরও যুদ্ধ ও হানাহানি বন্ধ হয়নি, তবে অনেক সংকট আলোচনার মাধ্যমে নিরসনের সুযোগ ঘটেছিল। সেটা যেমন ঘটেছে ভিয়েতনামে আমেরিকার সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে, তেমনই আয়ারল্যান্ডে শত বছরের সংঘাত অবসানে।

জাতিসংঘের ভূমিকা ও বর্তমান সংকট

জাতিসংঘ যুদ্ধ ও সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারেনি বটে, তবে আলোচনার প্ল্যাটফর্ম ও উপায় তা জুগিয়েছিল। তবে গোটা এই বিশ্বব্যবস্থা আজ ভেঙে পড়বার উপক্রম হয়েছে—গাজায় ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞে এবং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ সামরিক অভিযানে। চলমান এই সংকটের মধ্যেও মানবতায় আস্থা অটুট রাখা জরুরি এবং সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট্ট এক কাব্যগ্রন্থ ‘পত্রপুট’-এর পুনর্পাঠ আমাদের সহায় হতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পত্রপুট: দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আঁধারে লেখা কবিতা

১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘পত্রপুট’-এর প্রথম মুদ্রণে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ষোলোটি কবিতা, শিগগিরই গ্রন্থের দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয় এবং রবীন্দ্রনাথ অন্তর্ভুক্ত করেন আরও দুটি কবিতা। এই আঠারোটি কবিতার কোনোটির কোনো শিরোনাম ছিল না, সংখ্যাবাচক পরিচয় দিয়ে রবীন্দ্রনাথ তা গ্রন্থভুক্ত করেছিলেন, মনে হতে পারে—আঠারোটি কবিতার সম্মিলনে তিনি তাঁর অন্তরের আকুতি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন এবং আমাদেরও তাই কবিতাগুলো একত্রে পাঠ ও বিবেচনা করতে হবে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ঘনায়মান আঁধারের পটভূমিকায় লেখা হয়েছিল ‘পত্রপুট’-এর কবিতাগুলো। ততদিনে মারণাস্ত্র তৈরি ও প্রয়োগে রাষ্ট্রগুলো অনেক আধুনিক হয়ে উঠেছিল। ঊর্ধ্ব-আকাশ থেকে নিক্ষিপ্ত বোমায় অনেক ধ্বংস ডেকে আনা যায়, অনেক স্থাপনা ধ্বংস করে দেওয়া যায়, ফলে আসন্ন যুদ্ধ যে প্রথম মহাযুদ্ধের তুলনায় আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে—সেটা রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন।

আধুনিক মারণাস্ত্রের বেমানবীকরণ

আজ আমরা যে আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, মহাকাশ থেকে মর্ত্যের সুলুক-সন্ধান এবং সেই তথ্যের সহায়তায় লক্ষ্যবস্তু গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব, যা অসহায়ভাবে আমরা প্রত্যক্ষ করে চলছি, তার সূচনা শনাক্ত করতে পেরেছিলেন কবি। মারণাস্ত্র যত আধুনিক, বিধ্বংসী ও প্রাণসংহারী হয়ে উঠছে, ততই তা দূরত্ব তৈরি করছে হন্তারক মানুষ ও হত্যার শিকার অসহায় নারী-শিশু-বৃদ্ধ সাধারণজনের মধ্যে। এখন হত্যাকারী বসে থাকে হাজার মাইল দূরে কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে, সে কেবল আলতো হাতে বোতামে চাপ দেয়, মুহূর্তেই কম্পিউটারের পর্দায় ভেসে ওঠে টারগেট বিধ্বস্ত হওয়ার ছবি, মারণাস্ত্রের সাফল্যের বার্তা, কোথাও কোনও ক্রন্দন নেই, নেই হাহাকার আর্তনাদ। তবে দূরের জনপদে কী ভয়ংকর ধ্বংস তা ডেকে আনে, সেটা সেই বসতির বাসিন্দারা বোঝে।

রবীন্দ্রনাথের ইরান সফর ও বোমাবর্ষণের অভিজ্ঞতা

হত্যার এমন বেমানবীকরণের প্রক্রিয়া, আজকের বিচারে খুব ছোট আকারে, প্রত্যক্ষ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩২ সালে তাঁর ইরান সফরকালে। সত্তরোর্ধ্ব বয়সে পারস্যের আমন্ত্রণ তিনি উপেক্ষা করতে পারেননি। বড় কারণ ছিল তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি ছিলেন পারস্যের কবি হাফিজের একান্ত অনুরাগী। এশিয়ার দুই মহান সভ্যতার উত্তরাধিকার বহন করছে পারস্য ও ভারতবর্ষ, উভয়ের মিলনসূত্র ঠাকুর পরিবারের ঐতিহ্যে প্রোথিত ছিল। তাই তিনি পারস্যে যেতে আগ্রহী ছিলেন এবং শারীরিক কারণে কিছুটা অংশ তাঁকে বিমানে পাড়ি দিতে হয়েছিল। এই বিমানযাত্রার একপর্যায়ে তিনি ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। আকাশ থেকে মারণাস্ত্র নিক্ষেপ করে মাটিতে মানুষের প্রাণসংহারের পদ্ধতি তখন সবে বিকশিত হচ্ছিল এবং এর প্রয়োগও ঘটেছিল নানা স্থানে।

বাগদাদ থেকে ইরানের বুশেয়ার পর্যন্ত যাত্রা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পন্ন করেছিলেন আকাশপথে। বিমান থেকে দূরের গ্রাম কিংবা বসতি দেখা যায় ছায়ার মতো, ধূসর, বহু দূরবর্তী। তখন আলাপচারিতায় সহযাত্রী খ্রিষ্টান পাদরির কাছ থেকে তিনি জেনেছিলেন, ব্রিটিশ বিমানবাহিনী এই অঞ্চল দখলে আনতে আকাশ থেকে বিমান হামলা চালাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:

“বোগদাদে ব্রিটিশদের আকাশফৌজ আছে। সেই ফৌজের খ্রীস্টান ধর্মযাজক আমাকে খবর দিলেন, এখানকার কোন্ধস শেখদের গ্রামে তাঁরা প্রতিদিন বোমা বর্ষণ করছেন। সেখানে আবালবৃদ্ধবণিতা যারা মরছে তারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঊর্ধ্বলোক থেকে মার খাচ্ছে; এই সাম্রাজ্যনীতি ব্যক্তিবিশেষের সত্তাকে অস্পষ্ট করে দেয় বলেই তাদের মারা এত সহজ। খ্রীস্ট এই সব মানুষকেও পিতার সন্তান বলে স্বীকার করেছেন, কিন্তু খ্রীস্টান ধর্মযাজকের কাছে সেই পিতা এবং তাঁর সন্তান হয়েছে অবাস্তব, তাঁদের সাম্রাজ্যতত্ত্বের উড়োজাহাজ থেকে চেনা গেল না তাদের, সেজন্যে সাম্রাজ্যজুড়ে আজ মার পড়ছে সেই খ্রীস্টেরই বুকে। তা ছাড়া উড়োজাহাজ থেকে এসব মরুচারীদের মারা যায় এত অত্যন্ত সহজে, ফিরে মার খাওয়ার আশঙ্কা এতই কম যে মারের বাস্তবতা তাতেও ক্ষীণ হয়ে আসে। যাদের অতি নিরাপদে মারা সম্ভব মারওয়ালাদের কাছে তারা যথেষ্ট প্রতীয়মান নয়। এই কারণে, পাশ্চাত্য হননবিদ্যা যারা জানে না তাদের মানবসত্তা আজ পশ্চিমের অস্ত্রীদের কাছে ক্রমশই অত্যন্ত ঝাপসা হয়ে আসছে।”

পত্রপুটের কবিতায় যুদ্ধের ছবি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই অভিজ্ঞতা আরও বেদনাবহ ও নিবিড় হয়েছিল পরবর্তী ঘটনাধারায় যার পরিচয় রয়েছে ‘পত্রপুট’-এর কবিতায়। তাই ১৭ সংখ্যক কবিতায় তিনি লিখেছিলেন:

“যুদ্ধের দামামা উঠল বেজে/ওদের ঘাড় হোলো বাঁকা, চোখ হোলো রাঙা/কিড়মিড় করতে লাগল দাঁত/মানুষের কাঁচা মাংসে যমের ভোজ ভরতি করতে/বেরোল দলে দলে/বেজে উঠল তুরী ভেরী গরগর শব্দে/কেঁপে উঠল পৃথিবী/কেননা ওরা যে জাগাবে মর্মভেদী আর্তনাদ/অভ্রভেদ ক’রে/ছিঁড়ে ফেলবে ঘরে ঘরে ভালবাসার বাঁধনসূত্র।”

ধ্বংসের যে ছবি রবীন্দ্রনাথ এঁকেছেন তা আমাদের হকচকিয়ে দেয়, মনে হবে প্রতিদিন টেলিভিশনে ল্যাপটপে মোবাইলের পর্দায় আমরা যুদ্ধ ও হানাহানির যেসব নিষ্ঠুর ছবি দেখছি, তাই যেন রূপ পেয়েছে কবিতায়। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:

“ধ্বজা তুলবে লুপ্তপল্লীর ভস্মস্তূপে/দেবে ধুলোয় লুটিয়ে বিদ্যানিকেতন/দেবে চুরমার করে সুন্দরের আসনপীঠ/বেজে উঠল তুরী ভেরী গরগর শব্দে/কেঁপে উঠল পৃথিবী/ওরা হিসাব রাখবে ম’রে পড়ল কত মানুষ/পঙ্গু হয়ে গেল কয়জনা/তারি হাজার সংখ্যার তালে তালে/ঘা মারবে জয়ডঙ্কায়/পিশাচের অট্টহাসি জাগিয়ে তুলবে/শিশু আর নারীদেহের ছেঁড়া টুকরোর ছড়াছড়িতে/ওদের এই মাত্র নিবেদন, যেন বিশ্বজনের কানে পারে/মিথ্যামন্ত্র দিতে/যেন বিষ পারে মিশিয়ে দিতে নিঃশ্বাসে।”

কবিতার অংশবিশেষ এখানে একত্রে গেঁথে দেওয়া হলো। এই কবিতা পাঠে আমরা কি বর্তমানে সংঘটিত আমেরিকার ইরান আগ্রাসন এবং সভ্যতার সব রীতিনীতি বিসর্জন দিয়ে মার্কিনি নির্বিচার মারণাস্ত্র আঘাত অথবা গাজায় চলমান ইসরায়েলি নৃশংসতার ছায়াপাত দেখতে পাই না? কবি যেন দ্রষ্টা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই দ্রষ্টার ভূমিকা পালন করেছেন ‘পত্রপুট’-এ। ধিক্কার জানিয়েছেন বলদর্পী পাশ্চাত্য সভ্যতাকে, বলেছেন ধ্বংসের পাশাপাশি বিশ্বজনের কানে মিথ্যামন্ত্র দেয়া হচ্ছে, নিশ্বাসে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিষ।

উপসংহার: পত্রপুটের আজকের প্রাসঙ্গিকতা

‘পত্রপুট’ তাই আমাদের বর্তমান বিশ্বসংকটেরও ভাষ্য, সেইসঙ্গে দানবের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রত্যয়ও এখানে খুঁজে পাওয়া যায়।

লেখক: গবেষক, লেখক, প্রকাশক এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি