পিতার সর্বনাশ: রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথের অপার মহিমা
পিতার সর্বনাশ: রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথের অপার মহিমা

ভারতবর্ষে কোন ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি তাঁর বাবার সর্বনাশ করেছেন? বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক গভীর রাতের আড্ডায় বন্ধু তরুণ সরকার হঠাৎ এই প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিয়েছিল। প্রশ্নটা শুনে প্রথমে আমরা হেসে উঠেছিলাম। কারণ ‘সর্বনাশ’ শব্দটা শুনলেই মনে হয় কেউ বুঝি বাবার সম্পত্তি উড়িয়ে দিয়েছে, পরিবার ধ্বংস করেছে কিংবা বাবার নাম ডুবিয়েছে। আমরা তাই নানা জনের নাম বলতে শুরু করলাম। কেউ বলল কোনো রাজনীতিকের নাম, কেউ কোনো বিত্তশালী পরিবারের উচ্ছৃঙ্খল সন্তানের নাম। কিন্তু তরুণ সরকার যে নামটি বলেছিল, তার জন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না।

সে খুব গম্ভীরভাবে বলেছিল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর! আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। রবীন্দ্রনাথ আবার কীভাবে বাবার সর্বনাশ করেন? তখন তরুণ বলেছিল, রবীন্দ্রনাথ জন্ম না নিলে তাঁর বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক বিশাল মহাপুরুষ হিসেবে আরও বেশি আলোচিত হতেন। তাঁর যে জীবন, যে সততা, যে চিন্তা, যে সমাজ সংস্কার, যে সাংস্কৃতিক অবদান— তা একজন মানুষকে ইতিহাসে অমর করে রাখার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা এতটাই আকাশছোঁয়া ছিল যে তাঁর পিতার মহত্ত্ব অনেকটাই সেই বিশাল আলোর আড়ালে চাপা পড়ে গেছে।

সত্যি বলতে কী, আমরা সবাই রবীন্দ্রনাথকে চিনি। তাঁর গান জানি, কবিতা জানি, গল্প জানি, উপন্যাস জানি। জন্মদিন এলে অনুষ্ঠান করি, রবীন্দ্রসঙ্গীত গাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় তাঁর উদ্ধৃতিতে। কিন্তু তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি? খুব বেশি নয়। অথচ এই মানুষটির জীবন নিজেই এক মহাকাব্য।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দেবেন্দ্রনাথের আত্মমর্যাদার এক অনন্য দৃষ্টান্ত

দেবেন্দ্রনাথের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যাক। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন বারো বছর পূর্ণ হয়নি। সেই সময় বালক রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে দেবেন্দ্রনাথ ভ্রমণে বের হয়েছিলেন। শান্তিনিকেতন থেকে কানপুর হয়ে অমৃতসরের পথে। ট্রেন এক বড় স্টেশনে থেমেছে। টিকিট পরীক্ষক এসে টিকিট দেখতে চাইল। রবীন্দ্রনাথের জন্য কাটা হয়েছিল হাফ টিকিট। কারণ বয়স তখন বারোর নিচে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে বয়সের তুলনায় একটু বেশি পরিণত মনে হচ্ছিল। টিকিট পরীক্ষকের সন্দেহ হলো। সে স্টেশনমাস্টারকে ডেকে আনল।

স্টেশনমাস্টার এসে দেবেন্দ্রনাথকে প্রশ্ন করলেন, আপনার পুত্রের বয়স কি সত্যিই বারোর নিচে? দেবেন্দ্রনাথ শান্তভাবে বললেন, হ্যাঁ, এখনো বারো হয়নি। কিন্তু তাঁর কথা বিশ্বাস করা হলো না। স্টেশনমাস্টার জানিয়ে দিলেন, পুরো ভাড়া দিতে হবে।

দেবেন্দ্রনাথ এতে ভীষণ রুষ্ট হন। তিনি বাক্স খুলে টাকা দিলেন। টিকেটের টাকা কেটে রেখে যখন বাড়তি টাকা তাঁকে ফেরত দেওয়া হলো, তিনি সেই টাকা প্ল্যাটফর্মে ছুঁড়ে ফেললেন। ঝনঝন শব্দে কয়েন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। কারণ তাঁকে সন্দেহ করা হয়েছিল। সামান্য কিছু টাকার জন্য তিনি মিথ্যা বলবেন— এই ধারণাটাই তাঁকে ভীষণভাবে আহত করেছিল।

এই ছোট্ট দৃশ্যটি যেন পুরো মানুষ দেবেন্দ্রনাথকে আমাদের সামনে দাঁড় করায়। তিনি কেবল জমিদার ছিলেন না, কেবল ধর্মগুরু ছিলেন না, কেবল ধনী পরিবারের সন্তানও ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন এক মানুষ, যার কাছে আত্মমর্যাদা ছিল পৃথিবীর সব সম্পদের চেয়ে বড়।

বাংলার সমাজজীবনে দেবেন্দ্রনাথের অবদান

বাংলার সমাজজীবনে তাঁর অবদানও বিস্ময়কর। আমরা আজ যে পৌষমেলা দেখি, যে মাঘোৎসব দেখি, শান্তিনিকেতনের যে ঐতিহ্য দেখি, তার শেকড়ের গভীরে দাঁড়িয়ে আছেন দেবেন্দ্রনাথ। শিক্ষাবিস্তার, সমাজ সংস্কার, ব্রাহ্ম আন্দোলন, সংস্কৃতির নতুন চেতনা— সবখানেই তাঁর উপস্থিতি ছিল।

তিনি অসংখ্য মেধাবী ছাত্রকে বৃত্তি দিয়েছেন। এমন অনেক দরিদ্র ছাত্র ছিল, যাদের তিনি নিজের খরচে বিদেশে পাঠিয়েছেন পড়াশোনার জন্য। পরে তারা কেউ চিকিৎসক হয়েছেন, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ সমাজ সংস্কারক। জমিদার হয়েও তিনি ছিলেন প্রজাদরদী। দরিদ্র মানুষের কর মওকুফের জন্য লড়েছেন। ব্রিটিশ শাসনের ভেতর দাঁড়িয়ে ভারতের স্বায়ত্তশাসনের দাবিও তুলেছিলেন। এমন মানুষ তো ইতিহাসে খুব বেশি জন্মায় না।

পিতার ঋণের বোঝা বহন করে মহর্ষি হওয়া

কিন্তু তাঁর জীবনকে আরও বিস্ময়কর করে তোলে আরেকটি বিষয়। তাঁর পিতা দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির, আড়ম্বরপ্রিয় একজন মানুষ। তাঁর জীবন ছিল বিলাসিতা, রাজকীয়তা আর বিপুল ব্যয়ের জীবন। আয় করতেন অনেক, কিন্তু খরচ করতেন আরও বেশি। ইউরোপীয় অভিজাতদের মতো জীবনযাপন করতে তিনি ভালোবাসতেন। ইংরেজ সাহেবদের সঙ্গে মেলামেশা, জাঁকজমকপূর্ণ ভোজসভা, দামি পোশাক, বিশাল আয়োজন— সবকিছু মিলিয়ে তিনি ছিলেন একেবারে অন্য ধরনের মানুষ।

কিন্তু জীবনের শেষদিকে ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসান তাঁকে বিপুল ঋণের মধ্যে ফেলে দেয়। মৃত্যুর সময় তাঁর ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় তিন কোটি টাকা। আজকের হিসাবে যা কয়েক হাজার কোটি টাকার সমান। সেই ঋণের বোঝা এসে পড়ল দেবেন্দ্রনাথের কাঁধে। তিনি চাইলে হয়তো হাত তুলে বলতে পারতেন, এটা আমার দায় নয়। কিন্তু তিনি তা করেননি। বছরের পর বছর ধরে ঋণ শোধ করেছেন। পুরোপুরি শোধ করতে তাঁর প্রায় ৪০ বছর লেগে যায়। একজন মানুষ, যিনি নিজের জীবন বিলাসে কাটাতে পারতেন, তিনি বরং কাটালেন দায়িত্ব পালন করে। আজকের দিনে উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পদ পেলে অনেকে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন। দেবেন্দ্রনাথ উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন ঋণ। কিন্তু সেই ঋণের বোঝা বহন করেও তিনি মহর্ষি হয়ে উঠেছিলেন।

সাহিত্য ও দর্শনচিন্তায় দেবেন্দ্রনাথ

সাহিত্য ও দর্শনচিন্তাতেও দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব। তাঁর গদ্যের ভাষা ছিল বলিষ্ঠ, দীপ্ত ও গভীর ভাবসম্পন্ন। তিনি লিখেছিলেন, “যিনি সূর্য্যের অন্তরাত্মা, আমাদের অন্তরাত্মা, সকলের অন্তরাত্মা, তিমিরমুক্ত জগতের প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার প্রকাশ হয়।” এই ভাষা শুধু ধর্মীয় ভাবনার ভাষা নয়, এটি এক উচ্চমানের সাহিত্যিক চেতনারও পরিচয়।

আবার অন্যত্র তিনি লিখেছিলেন, “সুখ-দুঃখ সংসারে চিরকালই বিচরণ করিতেছে। সমুদ্রের তরঙ্গ যেমন চিরদিনই আছে, সমুদ্র কখনো নিস্তরঙ্গ হইবে না, তেমনি সুখ-দুঃখ কেবল মনুষ্যের ভাগ্যে নাই, পশু-পক্ষীর মধ্যেও আছে।” এই লেখাগুলো পড়লে বোঝা যায়, দেবেন্দ্রনাথ শুধু ধর্মীয় নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন গভীর পর্যবেক্ষক, চিন্তক ও অসাধারণ গদ্যশিল্পী।

প্রকৃতিপ্রেম ও আধ্যাত্মিকতা

পুত্র রবীন্দ্রনাথের মতো তিনিও ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী। প্রকৃতির ভেতর তিনি ঈশ্বরকে অনুভব করতেন। তাঁর আত্মজীবনীর পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে প্রকৃতির অপূর্ব বর্ণনা। তিনি লিখেছিলেন, ভোরের বাগানে হাঁটার সময় আফিমফুলের ওপর শিশিরবিন্দু, ঘাসের ওপর রূপালি আভা, বাতাসের সুগন্ধ, ময়ূরের রঙিন পেখম — সবকিছু মিলিয়ে যেন তাঁর কাছে এক গন্ধর্বপুরীর আবির্ভাব ঘটত। এই বর্ণনাগুলো পড়লে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিপ্রেম কোথা থেকে এসেছে তা বুঝতে আর বাকি থাকে না। পুত্র যেন পিতার কাছ থেকেই প্রকৃতিকে দেখার সেই বিস্ময়ময় চোখটি পেয়েছিলেন।

তবে দেবেন্দ্রনাথের প্রকৃতিপ্রেম নিছক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য ছিল না। প্রকৃতির মধ্যে তিনি ঈশ্বরের প্রকাশ দেখতেন। সমুদ্রের নীল জল দেখে তিনি লিখেছিলেন, ‘অনন্ত নীলোজ্জল সমুদ্রে দিনরাত্রির বিভিন্ন বিচিত্র শোভা দেখিয়া অনন্ত পুরুষের মহিমায় নিমগ্ন হইলাম।’

তাঁর জীবনের আরেকটি বড় দিক ছিল আধ্যাত্মিকতা। কুড়ি বছর বয়সে পিতামহীর মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। নিমতলা শ্মশানে বসে তিনি এক অদ্ভুত আত্মিক অনুভূতি লাভ করেন। পরে তিনি লিখেছিলেন, সেই অনুভূতির আনন্দ ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়। এরপর উপনিষদের দর্শন তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন আনে। বিশেষ করে ঈশোপনিষদের প্রথম শ্লোক তাঁর চিন্তার জগৎ বদলে দেয়। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন এক আধ্যাত্মিক মানুষ। কিন্তু তাঁর আধ্যাত্মিকতা ছিল না লোকদেখানো। তা ছিল মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের সঙ্গে মিশে থাকা এক গভীর মানবিকতা।

শান্তিনিকেতনের ভিত্তি স্থাপন

আজ আমরা শান্তিনিকেতনকে দেখি বিশ্বসংস্কৃতির এক প্রতীক হিসেবে। কিন্তু একসময় সেই এলাকা ছিল ডাকাতদের ভয়ংকর আস্তানা। রাতে কেউ সাহস করে সেখানে যেত না। সেই জায়গাতেই দেবেন্দ্রনাথ দুটি ছাতিম গাছসহ কিছু জমি ইজারা নেন। সেখানে বসে ধ্যান করতেন। পরে সেখানে গড়ে তোলেন অতিথিশালা। নাম দেন শান্তিনিকেতন। আজকের ছাতিমতলা সেই স্মৃতিরই অংশ।

ধীরে ধীরে সেই অঞ্চল বদলাতে শুরু করে। কুখ্যাত ডাকাতরাও তাঁর ব্যক্তিত্বে প্রভাবিত হয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল বলে জনশ্রুতি আছে। ভাবা যায়, একজন মানুষের নৈতিক শক্তি কতটা গভীর হলে ডাকাতেরাও তাঁর সামনে মাথা নত করে! পরে তিনি উপাসনাগৃহ নির্মাণ করলেন। পৌষমেলার সূচনা করলেন। ছোট্ট এক জনপদকে তিনি এক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ভিত্তি দিয়ে গেলেন। পরে সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতী গড়ে তুললেন।

উপসংহার

এখানেই সবচেয়ে বড় সত্যটি লুকিয়ে আছে। আমরা যখন রবীন্দ্রনাথকে দেখি, তখন তাঁর বিশাল প্রতিভার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হই। কিন্তু অনেক সময় ভুলে যাই, এই মানুষটি যে পরিবারে জন্মেছিলেন, সেই পরিবারের পরিবেশ কেমন ছিল। তাঁর পেছনে কেমন একজন পিতা ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ যেন এক মহীরুহ বৃক্ষ। আর দেবেন্দ্রনাথ সেই মাটি, যেখানে সেই বৃক্ষের শিকড় গভীরে প্রবেশ করেছিল। বৃক্ষ সবাই দেখে। কিন্তু মাটিকে কেউ মনে রাখে না। তবু মাটি ছাড়া বৃক্ষ দাঁড়াতে পারে না। তাই হয়তো তরুণ সরকারের কথার ভেতরে গভীর সত্য ছিল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পিতার সর্বনাশ করেননি ধ্বংসের অর্থে। তিনি তাঁর পিতাকে এতটাই আড়াল করে ফেলেছেন যে আমরা অনেকেই দেবেন্দ্রনাথের মহত্ত্ব বুঝতেই পারি না।

ইতিহাসে অনেক সময় পুত্রের খ্যাতি এতটাই বিস্তৃত হয় যে পিতা আড়ালে চলে যান। কিন্তু আড়ালে থাকলেই মহত্ত্ব মুছে যায় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্ময়কর প্রতিভার পেছনে যে নীরব শক্তি, যে নৈতিক ভিত্তি, যে আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার কাজ করেছিল, তার বড় অংশ জুড়ে ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাই রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে গেলেও দেবেন্দ্রনাথকে স্মরণ করতে হয়। গত ১৫ মে ছিল মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস। বিরল এই মহাপুরুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।