যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ব্যস্ত, চীন গোপনে প্রযুক্তি যুদ্ধের নীলনকশা প্রকাশ করেছে
যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ব্যস্ত, চীন প্রযুক্তি যুদ্ধের নীলনকশা প্রকাশ করেছে

যুক্তরাষ্ট্রের ইরান মনোযোগে চীনের গোপন প্রযুক্তি অভিযান

যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত, তখন চীন নিঃশব্দে একটি উচ্চাভিলাষী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, যা আগামী দশকগুলোর বৈশ্বিক ক্ষমতার সমীকরণ পাল্টে দিতে পারে। গত ৫ মার্চ ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসে উন্মোচিত ১৪১ পৃষ্ঠার এই নথিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং বিরল খনিজের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা চীনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার রূপরেখা তুলে ধরে।

প্রযুক্তিগত সংহতির রূপকল্প

চীনের এই ব্লুপ্রিন্ট কোনো সাধারণ অর্থনৈতিক নীতি নয়, বরং এটি একটি জাতীয় প্রযুক্তিগত সংহতি বা প্রস্তুতির মতো। নথিতে বারবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উল্লেখ রয়েছে, যেখানে বেইজিং আগামী এক দশকের মধ্যে তাদের অর্থনীতির সিংহভাগে এআইকে একীভূত করার লক্ষ্য স্থির করেছে। মানুষসদৃশ রোবটকে একটি প্রধান শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার উৎপাদন আগামী পাঁচ বছরে দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এছাড়াও, এই পরিকল্পনায় কোয়ান্টাম যোগাযোগ নেটওয়ার্ক, নিউক্লিয়ার ফিউশন গবেষণা এবং ‘ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস’ প্রযুক্তির উন্নয়নের অঙ্গীকার করা হয়েছে। চীনের অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত চমকপ্রদ, যেখানে শুধুমাত্র এআই–সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোর মূল্য ১০ লাখ কোটি ইউয়ান ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করা হচ্ছে, যা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার কোটি ডলারের সমতুল্য।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত কৌশল বনাম চীনের বিস্তৃত পরিকল্পনা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান পদক্ষেপ হলো ২০২২ সালে পাস হওয়া ‘চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্ট’, যা অভ্যন্তরীণ সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন শক্তিশালী করতে ৫ হাজার ২৭০ কোটি ডলার বরাদ্দ দেয়। এই উদ্যোগের ফলে দেশজুড়ে ১৪০টির বেশি প্রকল্পে বেসরকারি বিনিয়োগ এসেছে এবং উচ্চ-দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তবে, বিশ্লেষক শানাকা আনসেলাম পেরেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে উল্লেখ করেছেন যে, এটি শুধুমাত্র চিপসের বিষয়ে সীমাবদ্ধ, যেখানে চীনের কৌশল অনেক বেশি বিস্তৃত।

চীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভারী শিল্প থেকে শুরু করে সেবা খাত—সব জায়গায় ছড়িয়ে দিতে চায় এবং রোবোটিকসকে শিল্প উৎপাদনের মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। পেরেরা এই পার্থক্যকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন: ‘চিপস অ্যাক্ট হলো একটি রাইফেল, আর পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হলো একটি অস্ত্রাগার।’

বিরল খনিজের কৌশলগত গুরুত্ব

এই অস্ত্রাগারের কেন্দ্রে রয়েছে বিরল খনিজ উপাদান, যা ইলেকট্রিক গাড়ি, ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং অত্যাধুনিক রাডার তৈরির জন্য অপরিহার্য। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ চীনের নিয়ন্ত্রণে, এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিং এই খাতের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করেছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিটি এফ–৩৫ যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিন ও সেন্সর তৈরিতে শত শত পাউন্ড বিরল খনিজ প্রয়োজন হয়।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে পেন্টাগনের চুক্তিতে চীনা খনিজ উপাদান ব্যবহার বন্ধ করার পরিকল্পনা করেছে, যা মার্কিন সরবরাহকারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরান বা গাজা সংকটে গোলাবারুদ খরচ করার মাধ্যমে বিরল খনিজের ঘাটতির মুখোমুখি হতে পারে, যখন চীন সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে কৌশলগত সুবিধা অর্জন করছে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও বৈশ্বিক পরিণতি

চীনের এই উদ্যোগের মাত্রা দেখে বোঝা যায়, এটি একটি সুসংগঠিত জাতীয় শিল্প প্রচেষ্টা, যা স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে চায়। পেরেরা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, চীনের কৌশলের ব্যাপকতাই একে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে, এবং এটি এমন এক যুদ্ধের পরিকল্পনা, যা যুক্তরাষ্ট্র লড়ছেই না।

বিশ্লেষকদের মতে, চীন যদি কাঁচামাল, রোবোটিকস এবং এআইকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অধীনে আনতে সফল হয়, তবে পরবর্তী বৈশ্বিক পরাশক্তি হওয়ার লড়াই সরবরাহ চেইন এবং কারখানার ভেতরেই নির্ধারিত হবে, যুদ্ধবিমানের লড়াইয়ে নয়। এই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তাই শুধুমাত্র একটি অর্থনৈতিক নথি নয়, বরং একটি কৌশলগত অস্ত্র, যা বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ রূপ দিতে পারে।