চট্টগ্রামে হামের প্রাদুর্ভাব: স্থানীয় পরীক্ষা বন্ধ, নমুনা ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে
চট্টগ্রামে হামের লক্ষণে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু পরীক্ষার কিট সংকটের কারণে সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানেই স্থানীয়ভাবে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে না। এই সংকটের মুখে রোগীদের নমুনা রাজধানী ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে, যা চিকিৎসায় বিলম্ব ঘটাচ্ছে এবং উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
পরিসংখ্যানে উদ্বেগজনক চিত্র
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার শেষ ২৪ ঘণ্টায় চারটি নতুন হামের কেস নিশ্চিত হয়েছে, যা জেলায় মোট নিশ্চিত কেসের সংখ্যা ১২-এ নিয়ে গেছে। একই সময়ে, হামের মতো লক্ষণ নিয়ে ১৬ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যার ফলে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৭-এ। এই সময়ে উপজেলা পর্যায় থেকে কোনো সন্দেহভাজন কেস রিপোর্ট করা হয়নি।
গত ২৪ ঘণ্টায় মোট ৩২টি নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজেলস-রুবেলা ল্যাবরেটরিতে (এনপিএমএল) পাঠানো হয়েছে। এ পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে ১৫৫টি নমুনা পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে ৭০টি শহর থেকে এবং ৮৫টি বিভিন্ন উপজেলা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
স্থানীয় পরীক্ষা কেন বন্ধ?
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলাম জানিয়েছেন, স্থানীয়ভাবে পরীক্ষা না হওয়ায় নমুনা ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। তিনি বলেন, “রিপোর্ট সাধারণত দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পাওয়া যায়।” তবে তিনি এও যোগ করেন যে, প্রাদুর্ভাব বাড়লে স্থানীয়ভাবে পরীক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
২০১৩ সালে ফৌজদারহাটে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) আধুনিক সুবিধা সমৃদ্ধ একটি ল্যাবরেটরি, যেখানে রিয়েল-টাইম পিসিআর এবং ইলাইজা মেশিন রয়েছে। এই ল্যাব হাম ও রুবেলার মতো বিভিন্ন সংক্রামক রোগের পরীক্ষা করতে সক্ষম। কিন্তু বিআইটিআইডির অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশিদ বলেছেন, হাম সাধারণত লক্ষণের ভিত্তিতে ক্লিনিক্যালি নির্ণয় করা হয়।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “প্রায় ৯৯% কেস উচ্চ জ্বর, কাশি এবং ফুসকুড়ির মতো লক্ষণের মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়, যা সাধারণত মুখ ও কানের চারপাশে শুরু হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।” তিনি আরও বলেন, বিআইটিআইডিতে প্রযুক্তিগতভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব হলেও হাম-রুবেলা পরীক্ষার কিটের অভাবে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। “আমরা ইতিমধ্যে ঢাকা থেকে প্রয়োজনীয় কিট চেয়েছি। কিট এবং অনুমোদন পাওয়ার পর পরীক্ষা শুরু করা যাবে,” তিনি যোগ করেন।
রোগী ও অভিভাবকদের উদ্বেগ
রোগী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চিকিৎসায় বিলম্ব নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি এক শিশুর অভিভাবক জানান, পরীক্ষার ফলাফল পেতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগছে, যা চিকিৎসায় বিলম্ব ঘটাচ্ছে। এই বিলম্ব রোগীর অবস্থা জটিল হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদান হামের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় পর্যায়ে পরীক্ষার সুবিধা না থাকায় সময়ক্ষেপণ রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত পরীক্ষার কিট সরবরাহ নিশ্চিত করে স্থানীয় ল্যাবরেটরিগুলোর কার্যক্রম পুনরায় চালু করা। একই সাথে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।



