স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে হামের টিকা নিয়ে বিভ্রান্তি ও শঙ্কা
বেসরকারি চাকরিজীবী শামীমা নাসরিনের চার বছর বয়সী মেয়ে জন্মের পর থেকে সব টিকা পেয়েছে, যার মধ্যে হামের টিকাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু এখন তিনি দ্বিধাগ্রস্ত, তাঁর মেয়ে আদৌ হামের টিকা পেয়েছিল কিনা, নাকি অন্য টিকা দেওয়া হয়েছিল! এই দ্বিধার উৎস স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেনের সাম্প্রতিক বক্তব্য, যেখানে তিনি দাবি করেছেন আট বছর আগে হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল এবং এরপর আর দেওয়া হয়নি।
অভিভাবকদের উদ্বেগ ও বাস্তবতা
মন্ত্রীর এই মন্তব্য শামীমা নাসরিন বা রুমানা বেগমের মতো অনেক অভিভাবককে শঙ্কিত করেছে, বিশেষত যখন দেশে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং চলতি মাসে ৫০টির বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিষয়টি সরল নয়। সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির তথ্য অনুসারে, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত হামসহ নানা টিকাদানের হার সর্বনিম্ন ৮৯ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১০৩ শতাংশের বেশি ছিল, যা নির্দেশ করে নিয়মিত টিকাদান চালু ছিল।
মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ও বিভ্রান্তি
গত রোববার এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, 'আট বছর আগে হাম টিকা দেওয়া হয়েছিল, এরপর আর দেওয়া হয়নি।' এই বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ছিল হামের রোগী বৃদ্ধি এবং নতুন টিকা কেনার উদ্যোগ। তবে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, মন্ত্রী সম্ভবত বড় আকারের ক্যাম্পেইনের কথা বলেছেন, যা ২০২০ সালের ডিসেম্বরে হাম ও রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি হিসেবে পরিচালিত হয়েছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদও নিশ্চিত করেছেন যে প্রতিবছরই হামের টিকা দেওয়া হয়েছে, কোনো বছর বাদ যায়নি।
হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির আসল কারণ
প্রকৃত সংকট হলো সাম্প্রতিক টিকাদান হার হ্রাস। ২০২৫ সালে টিকাদানের হার ৫৯.৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা হার্ড ইমিউনিটি বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ৯৫ শতাংশ কভারেজের চেয়ে অনেক কম। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, গত দেড় বছরে টিকাদান কর্মসূচির হার বজায় রাখা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, কোভিড-পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা ব্যাঘাত, শহরের বস্তিতে টিকাদানে ফারাক, মাইগ্রেশন এবং মনিটরিং ঘাটতি এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে কাজ করছে।
মন্ত্রীর বক্তব্যের সম্ভাব্য প্রভাব
জনস্বাস্থ্যবিদ বেনজির আহমেদ সতর্ক করেন, মন্ত্রীর বক্তব্য বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে টিকাদান কর্মসূচির ওপর আস্থা কমাতে পারে এবং নীতিনির্ধারণে ভুল দিকনির্দেশনা দিতে পারে। তিনি জোর দেন যে উচ্চ মহলের কথা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হতে পারে, তাই সঠিক তথ্য প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামগ্রিকভাবে, সমস্যা টিকা না দেওয়া নয়, বরং সাম্প্রতিক কভারেজ ঘাটতিই হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির মূল কারণ।



