হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুমৃত্যু: টিকাদান কর্মসূচির গাফিলতি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সংকট
হামে শিশুমৃত্যু: টিকাদান কর্মসূচির গাফিলতি

হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুমৃত্যু: টিকাদান কর্মসূচির গাফিলতি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সংকট

সম্প্রতি বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা যারপরনাই দুঃখজনক হয়ে উঠেছে। চলতি মার্চ মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত দেশে হামের সংক্রমণে ৫৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা স্বাস্থ্য খাতের মারাত্মক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, অতিকেন্দ্রীভূত চিকিৎসাব্যবস্থা, আইসিইউর স্বল্পতা, দারিদ্র্য ও পরিবেশগত কারণে হামের সংক্রমণ বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিতে পারে।

টিকাদান কর্মসূচির থমকে যাওয়া

হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ, এবং বাংলাদেশ পোলিও ও ধনুষ্টংকার নির্মূলের পাশাপাশি হাম নিয়ন্ত্রণেও সফলতা অর্জন করেছিল। তবে বর্তমান প্রাদুর্ভাবের পেছনে টিকাদানের ঘাটতি মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু হাম নয়; দেশে ১০ রোগের টিকার সংকট দেখা দিয়েছে। ইপিআইয়ের কেন্দ্রীয় গুদামে বিসিজি, পেন্টা, বিওপিভি, পিসিভি, এমআর ও টিডি—এই ছয় টিকার মজুত শূন্য হয়ে পড়েছে। আইপিভি ও টিসিভি টিকার মজুত জুন মাস পর্যন্ত চলবে বলে জানা গেছে।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার রাজনৈতিকীকরণ

টিকাদান কর্মসূচি থমকে যাওয়ার পেছনে স্বাস্থ্য খাতের রাজনৈতিকীকরণ একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। কোভিড মহামারির সময় অনেক শিশু দ্বিতীয় ডোজ টিকা পায়নি, এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই এইচপিএনএসপি তথা ওপি–ব্যবস্থা বাতিল করে। এরপর নতুন প্রকল্প তৈরি, অনুমোদন ও অর্থছাড়ে দেরি হয়েছে। গত দেড় বছরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে টিকা কেনার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক পদেও বারবার পরিবর্তন এসেছে, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মাঠপর্যায়ের জনবলসংকট ও অসন্তোষ

টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ার আরেকটি কারণ হলো মাঠপর্যায়ের জনবলসংকট। দেশের ৩৭টি জেলায় মাঠপর্যায়ে ৪৫ শতাংশ কর্মী নেই, এবং টিকাদান কেন্দ্রে টিকা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে থাকা পোর্টাররা ৯ মাস ধরে বেতন না পাওয়ায় অসন্তোষে ভুগছেন। এসব কারণে মাঠপর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা শিশু স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।

জরুরি পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ করণীয়

নতুন সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জরুরি ভিত্তিতে হামের টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে, যা সাধুবাদযোগ্য। তবে শুধু হামের টিকা নয়, অন্যান্য জীবন রক্ষাকারী টিকা সংগ্রহের ব্যাপারেও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। করোনা মহামারির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে হামের সংক্রমণ রোধ ও আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।

  • দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করা
  • আক্রান্ত শিশুদের কমিউনিটি পর্যায়ে শনাক্ত ও আলাদা রাখা
  • জটিল রোগীদের জন্য আইসিইউসহ চিকিৎসা সরঞ্জামের জোগান নিশ্চিত করা

টিকাদানে বাংলাদেশের সাফল্যের সুনাম পুনরুদ্ধার করা জরুরি, এবং কেন টিকা ফুরাল, শিশুরা কেন মারা গেল—এর অনুসন্ধান ও তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের গাফিলতির কারণেই হামে এতগুলো শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে, যা একটি জাতীয় ট্র্যাজেডি হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।