কারাগারে চিকিৎসক-অ্যাম্বুলেন্স সংকটে বন্দিদের মৃত্যু বাড়ছে
কারাগারে চিকিৎসক-অ্যাম্বুলেন্স সংকটে বাড়ছে মৃত্যু

দেশের কারাগারগুলোতে চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্সের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এই সংকটের কারণে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে বন্দিদের মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে শুরু করে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার পর্যন্ত কোনো প্রশাসনই এই সমস্যার কার্যকর সমাধান করতে পারেনি। বরং ধাপে ধাপে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

অ্যাম্বুলেন্স সংকট

দেশের মোট ৭৪টি কারাগারের মধ্যে ৫৪টিতেই কোনো অ্যাম্বুলেন্স নেই। এসব কারাগারে বন্দিরা অসুস্থ হলে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা বড় বিপদে পড়েন। উপায় না পেয়ে অসুস্থ বন্দিদের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয় লেগুনা বা অন্য যানবাহন। বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোর বন্দি ধারণক্ষমতা মোট ৪২ হাজার ৫৯০ জন। তবে বাস্তবে সারা বছরই বন্দির সংখ্যা কমে-বেড়ে ৮৩ হাজারের মধ্যে থাকে। যে ৫৪টি কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স নেই, সেখানে বর্তমানে বন্দি রয়েছে প্রায় ৩৮ হাজার। এত বিপুল সংখ্যক বন্দির জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স না থাকাকে কারাসংশ্লিষ্টরা বড় সংকট বলে মনে করছেন।

চিকিৎসক সংকট

কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কারাগারগুলোতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ১৪৬টি। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত চিকিৎসক আছেন মাত্র দুই জন। ফলে বন্দিদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশে এখন ৬৮টি কারাগার রয়েছে। এর মধ্যে কেবল মানিকগঞ্জ কারাগার ও রাজশাহী ট্রেনিং সেন্টারে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক রয়েছেন। বাকি কারাগারগুলোতে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে খণ্ডকালীন চিকিৎসক দিয়ে সেবা চালানো হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সমাধানের উদ্যোগ

কারা সূত্র জানায়, গত তিন বছর ধরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ১০৭টি অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে প্রথম দফা একটি চিঠি দিয়েছে কারা অধিদপ্তর। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এ নিয়ে চিঠি চালাচালি চলেছে। কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজনস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, অনুমোদিত চিকিৎসকের সংখ্যা থাকলেও বাস্তবে তা পূরণ হয়নি। বর্তমানে মাত্র দুই জন চিকিৎসক স্থায়ীভাবে কর্মরত, বাকিরা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, সার্বক্ষণিক চিকিৎসক থাকলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে রোগীকে হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব হতো, এতে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো যেত। তিনি আরও জানান, চিকিৎসক সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে চিকিৎসক নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা চলছে, তবে এখনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।

অ্যাম্বুলেন্স সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় অনেক সময় বাইরে থেকে গাড়ি আনতে হয়, এতে বিলম্ব হয় এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। তবে আশার কথা, সম্প্রতি ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্সের অনুমতি মিলেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছে। বর্তমানে প্ল্যানিং কমিশনে রয়েছে। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্সগুলো সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।

মৃত্যুর পরিসংখ্যান

কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ জানিয়েছেন, কারাগার থেকে পথে বা হাসপাতালে নেওয়ার পর প্রায়ই অসুস্থ হয়ে বন্দিরা মারা যাচ্ছেন। এর একটি বড় কারণ হচ্ছে কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স নেই। এমনও কারাগার আছে যেখানে একাধিক অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন। তিনি জানান, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার, যশোর, কক্সবাজার, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট কারাগারে একাধিক অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন।

কারা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের ৭৪টি কারাগারের মধ্যে মাত্র ১৪টিতে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। এর মধ্যে কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দুটি অ্যাম্বুলেন্স, কাশিমপুর-১, কাশিমপুর-২, হাইসিকিউরিটি, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, যশোর এবং বরিশাল ও খুলনা কারাগারে একটি করে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। কক্সবাজার কারাগারের একটি অ্যাম্বুলেন্স ছিল, কিন্তু একটি সড়ক দুর্ঘটনার পর অ্যাম্বুলেন্সটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

কারা অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন ১ হাজার ৬৭০ জন। এ ছাড়া অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার সময় পথে মারা গেছেন ৫৬০ জন।

কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ বলেন, কারাগারে হঠাৎ একাধিক বন্দি অসুস্থ হলেও বড় বিপদে পড়েন সেখানে দায়িত্বরতরা। এ ছাড়া এখন কারাগারে অনেক ভিআইপি বন্দি রয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই জটিল রোগে আক্রান্ত। এমনও অনেকে আছেন যাদের সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সেবার প্রয়োজন হয়। অ্যাম্বুলেন্স না থাকার কারণে সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে।