রাজধানীতে ফের বেড়েছে মশার উপদ্রব। মশার উপদ্রব এতটাই বেড়েছে যে, দিনে-রাতে সমানতালে মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে বাসিন্দাদের ২৪ ঘণ্টা মশারি বা কয়েল ব্যবহার করতে হচ্ছে। বিশেষ করে কিউলেক্স ও এডিস মশার কামড়ে নাজেহাল নগরবাসীর জনজীবন। মশক নিধনে ঢাকা উত্তর (ডিএনসিসি) ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও এর সুফল মিলছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া মশক নিধনে ব্যবহৃত ওষুধের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নগরবাসী।
পরিসংখ্যান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, চলতি বছরে এই পর্যন্ত ২৫০০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ৪ জন। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, উত্তর সিটির ২৫টি ওয়ার্ড এডিস মশার সূচকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অপরদিকে দক্ষিণ সিটিতে কিউলেক্স মশার প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
নগরবাসীর ক্ষোভ ও ভোগান্তি
ঢাকা উত্তর সিটির সাঁতারকুল এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহজাহান আক্ষেপ করে বলেন, “সিটি করপোরেশন মাঝেমধ্যে ওষুধ দিলেও তাতে মশা মরে না। রাতের বেলা মশার যন্ত্রনায় ছেলেমেয়েরা পড়ার টেবিলে বসতে পারে না। এমনকি দিনের বেলায়ও মশা কামড়ায়। খাটের উপর ২৪ ঘণ্টা মশারি টাঙানো থাকে। ছোট ছোট মশা যত মারি, তার চেয়ে বেশি জন্ম নেয়।”
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের বাসিন্দা খন্দকার মাহবুবের মতে, মশা মারার চেয়ে উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করা বেশি জরুরি। তিনি বলেন, “পুরান ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও দুই বাড়ির মধ্যবর্তী সরু গলিতে ময়লার স্তূপ জমে থাকে। এসব জায়গা পরিষ্কার না করলে শুধু ওষুধ ছিটিয়ে লাভ নেই।” উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “যেসব জায়গায় দুই বাড়ির পাশে এক হাত বা তারও কম জায়গা খালি থাকে সেখানে বিভিন্ন ফ্ল্যাটের লোকজন ময়লা আবর্জনা ফেলে স্তুপ জমিয়ে রাখে। সেখানে মশা ভনভন করে, সেই মশাই মানুষের ঘরবাড়িতে যায়।”
বিশেষজ্ঞদের মত: কাঠামোগত ও বৈজ্ঞানিক সংকট
কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ঢাকার মশা সমস্যাকে কেবল ‘মৌসুমি’ নয়, বরং ‘কাঠামোগত ও বৈজ্ঞানিক সংকট’ হিসেবে দেখছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক, কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. কবিরুল বাশার বলেন, “বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য উপেক্ষা করলে তার মূল্য দিতে হবে মানুষের জীবন দিয়ে। বর্তমানে কিউলেক্স বাড়ছে এবং বর্ষায় এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাবে। নাগরিক অংশগ্রহণ ছাড়া ঢাকাকে মশামুক্ত করা অসম্ভব।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, “সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতার মাশুল দিতে হচ্ছে মানুষের জীবনের বিনিময়ে। মশা মারার ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন এবং এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বর্ষায় ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করতে পারে।”
নাগরিকদের সচেতনতার ওপর জোর দিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ডেঙ্গু বা মশার উপদ্রব কমাতে সিটি করপোরেশনের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ বাসস্থান ও আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং সচেতন হতে হবে। আমরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি, তবে নাগরিকদের অংশগ্রহণ ছাড়া সফলতা সম্ভব নয়। সবাই মিলে চেষ্টা করলে মশামুক্ত ঢাকার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব।”
প্রশাসকদের বক্তব্য ও বিশেষ অভিযান
মশক নিধনের ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে খোদ ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “ফগিং মেশিনে মশা মরে না, মশা মশার মতোই থাকে। শুনেছি ফগিংয়ের পর মশা অজ্ঞান হয়েছে কিনা— তা বুঝতে প্রায় ১২ ঘণ্টা সময় লাগে এবং সম্পূর্ণভাবে মারা গেছে কিনা— তা জানতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়!” তবে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রতি শনিবার ‘বাসাবাড়ি করি পরিষ্কার’ ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে। আগামী ৩০ মে পর্যন্ত প্রতি শনিবার এই কর্মসূচি চলমান থাকবে।
অপরদিকে ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম জানান, এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধ এবং নগরীকে পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রতি মাসের প্রথম শনিবারকে ‘ক্লিনিং ডে’ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ৯ মে থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।
তিনি আরও জানান, ডিএসসিসি এলাকার সব সরকারি প্রতিষ্ঠান, কোয়ার্টার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)-এর আওতাধীন এলাকা এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন প্লটগুলোতে নিজ নিজ উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “মশক নিধন কার্যক্রমে কোনও ধরনের গাফিলতি সহ্য করা হবে না এবং কীটনাশকের মান নিশ্চিতে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব বজায় রাখা হবে।”



