ময়মনসিংহে হামে আক্রান্ত শিশুদের জীবনরক্ষায় বাবল সিপ্যাপ পদ্ধতির ব্যবহার
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় বাবল সিপ্যাপ পদ্ধতি ব্যবহার করে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে। আইসিইউ সুবিধার অভাবে চিকিৎসকরা এই উদ্ভাবনী পদ্ধতির মাধ্যমে শিশুদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
শিশু নুসাইবার চিকিৎসা ও বাবল সিপ্যাপের প্রয়োগ
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরঈশ্বরদিয়া গ্রামের কারিমা আক্তারের আট মাস বয়সী মেয়ে নুসাইবা ৪ এপ্রিল হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। শিশুটির শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু হাসপাতালে শিশুদের জন্য আলাদা আইসিইউ ওয়ার্ড না থাকায় চিকিৎসকরা বুধবার থেকে বাবল সিপ্যাপ পদ্ধতি ব্যবহার শুরু করেন।
এই পদ্ধতিতে একটি প্লাস্টিকের পানির বোতল ব্যবহার করে বিশেষ যন্ত্র তৈরি করা হয়েছে। বোতলে পানি ভরে একটি নল লাগানো হয়, যা হাসপাতালের কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। এই নলের মাধ্যমে শিশুটির নাক দিয়ে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে।
হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের বর্তমান পরিস্থিতি
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। ৬৪ শয্যার ওয়ার্ডে বর্তমানে ৭৬ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে:
- ১৭ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ৩২৪ শিশু ভর্তি হয়েছে
- ২৩৯ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে
- ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে
- সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ২৬ শিশু নতুন করে ভর্তি হয়েছে
- একই সময়ে ২৬ শিশু সুস্থ হয়ে ছাড়া পেয়েছে
চিকিৎসকদের বক্তব্য ও পদ্ধতির কার্যকারিতা
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মাজহারুল আমিন বলেন, "শিশুদের আইসিইউ না থাকায় হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশুদের যখন অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, তখন বিকল্প হিসেবে বাবল সিপ্যাপ ব্যবহার করছি। সরকার এই পদ্ধতির জন্য প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "বাবল সিপ্যাপ দেওয়ার পর শিশুদের সাড়া খুব ভালো পাওয়া যাচ্ছে। বেশ কয়েকটি শিশু সুস্থতার দিকে এগোচ্ছে। ভর্তি শিশুদের মধ্যে সাত থেকে আট জন আইসিইউয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় ছিল, কিন্তু বাবল সিপ্যাপের মাধ্যমে তাদের শ্বাসকষ্ট কমে এসেছে।"
অন্যান্য ক্ষেত্রে বাবল সিপ্যাপের ব্যবহার
হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে আরও কয়েকটি শিশুকে বাবল সিপ্যাপ পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে:
- চুরখাই বেলতলী গ্রামের শিশু: স্বপন মিয়া ও চম্পা আক্তারের তিন মাস এগারো দিন বয়সী পুত্রসন্তান ৩১ মার্চ হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়। শিশুটিরও বাবল সিপ্যাপের মাধ্যমে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে।
- চকঢাকিরকান্দা গ্রামের সোহান: স্বপ্না আক্তারের নয় মাস বয়সী ছেলে সোহান ২২ মার্চ থেকে ভর্তি রয়েছে। শিশুটিকেও একই পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
আইসিইউ সুবিধার অভাব ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন মোহাম্মদ গোলাম মাওলা জানান, করোনা মহামারির সময় শিশুদের জন্য ছয় থেকে আট শয্যার আইসিইউ ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হলেও যন্ত্রপাতি ও জনবলের অভাবে সেটি চালু করা যায়নি। তিনি বলেন, "বিভিন্ন সময় চাহিদা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। গত সপ্তাহেও চাহিদা পাঠানো হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ লাগবে এমন রোগী এখন না থাকলেও শ্বাসকষ্টের রোগীদের অক্সিজেন ও বাবল সিপ্যাপ দিয়ে সাপোর্ট দিচ্ছি।"
হাম শনাক্তকরণ ও পরিসংখ্যান
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১৭২ শিশুর নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে হামের লক্ষণ নিয়ে শিশুরা ভর্তি হতে শুরু করে এবং মার্চের মাঝামাঝি থেকে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামের লক্ষণ নিয়ে আসা শিশুদের চিকিৎসায় তিনটি মেডিকেল টিম কাজ করছে। মৃত্যুবরণ করা শিশুদের ক্ষেত্রে হাম ও অপুষ্টির পাশাপাশি অন্যান্য উপসর্গও ছিল বলে জানানো হয়েছে।



