শিশু হাসপাতালে হাম আক্রান্তদের লড়াই: শয্যা নেই, স্বজনদের উদ্বেগ
রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে গতকাল রোববার দুপুরে দেখা গেল এক করুণ দৃশ্য। অসুস্থ শিশুদের শান্ত করতে স্বজনরা লাল বেলুন ধরছেন, কিন্তু এতে তারা আরও বিরক্ত হচ্ছেন। সাত মাস বয়সী রাইয়ানের নাকে নল লাগানো, হাতে ক্যানুলা করে স্যালাইন চলছে। তার নানি সালমা বেগম চিন্তিত কণ্ঠে বললেন, ‘শ্বাসকষ্ট বাড়ছে। ডাক্তাররা আইসিইউ লাগতে পারে বলে বলছে। আমরা যা করণ লাগে করছি।’ সিরাজগঞ্জ থেকে ঠান্ডা, জ্বর ও কাশি নিয়ে নাতিকে ভর্তি করেছিলেন, পরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
অভিভাবকদের উদ্বেগ ও সংগ্রাম
হাসপাতালের ওয়ার্ডে একাধিক পরিবারের সদস্যরা দিনের পর দিন থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। নয় মাস বয়সী মোহাম্মদ রিসালাতের মাথার অর্ধেক চুল ফেলে দিতে হয়েছে ক্যানুলা করার জন্য। সারা শরীরে ছোপ ছোপ দাগ ও ফুসকুড়ি, নাকে নল লাগানো। সে চরম বিরক্ত, একটু পরপর টান দিয়ে নাকের নল খুলে ফেলার চেষ্টা করছে। মা খাদিজা হাত ধরে রেখেছেন চুলকানো থেকে বিরত রাখতে। তিনি জানান, নোয়াখালীর দুই হাসপাতাল ও ঢাকার অন্য একটি হাসপাতাল ঘুরে ৯ দিন আগে এখানে ভর্তি হয়েছেন।
অন্যদিকে, রাজধানীর মিরপুর থেকে আসা মোসা. মীমের ৯ মাস বয়সী সন্তানের ১০৩ ডিগ্রি জ্বর। তিনি কাপড় ভিজিয়ে কপাল ও সারা শরীর মুছে দিচ্ছিলেন। অবস্থা খারাপ হওয়ায় নার্স মুখে অক্সিজেন লাগিয়ে দিলেন। গত ২০ মার্চ থেকে ভর্তি এই মায়ের সঙ্গে কথা বলার সাহসই হলো না অনেকের।
হাসপাতালের শয্যা সংকট ও পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে শয্যা আছে ৪৪টি, যার ভেতরে ১৬ শয্যার একটি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) রয়েছে। মোট ৬০টি শয্যা হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য, কিন্তু গতকাল কোনো শয্যাই খালি ছিল না। হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুল হক প্রথম আলোকে বলেন, হাম ছোঁয়াচে রোগ, তাই আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রাখা জরুরি। ৬০টি বিশেষ শয্যায় রোগী ভর্তি, এর বাইরে একক কেবিন ও আইসোলেশন ওয়ার্ডেও ভর্তি করতে হচ্ছে।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত ১৮৭ শিশুকে হামের জন্য ভর্তি করা হয়েছে, যাদের মধ্যে তিনটি মারা গেছে। গতকাল আইসিইউতে ভর্তি ১৪ শিশুর মধ্যে একটি লাইফ সাপোর্টে ছিল। ভর্তি রোগীদের মধ্যে ১১৮টির বয়স ৯ মাসের কম, পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশু আটটি। তবে কতজন টিকা নিয়েছে, সে তথ্য পাওয়া যায়নি।
চিকিৎসকদের সতর্কতা ও পরামর্শ
অধ্যাপক মাহবুবুল হক আরও বলেন, ‘অপ্রয়োজনীয় গ্যাদারিং বা মানুষ বেশি আছে, এমন জায়গায় শিশুদের নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে গেছে, এমন শিশুদের একদমই বাইরে নেওয়া যাবে না। হাম হোক বা না হোক, এমন শিশুদের স্কুলে পাঠানো যাবে না।’ তিনি বাবা-মাদের সতর্ক থাকতে বলেছেন, যদি শিশু অস্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেয়, তবে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। হাম হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, তাই ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো ও তরল খাবার দেওয়া জরুরি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতিদিন কিছুসংখ্যক রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছে, তাই শয্যা খালি পাওয়া যাচ্ছে। তবে ভর্তি না করে ফিরিয়ে দেওয়া রোগীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। এ পর্যন্ত ৭৭ শিশুর রক্তের স্যাম্পল পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে ৬৬টির রিপোর্টে ৩৫ শিশুর হামের অ্যান্টিবডি পজিটিভ পাওয়া গেছে।
অভিভাবকদের অর্থনৈতিক চাপ
হাসপাতালে থাকা অভিভাবকদের জন্য অর্থনৈতিক চাপও বেড়েছে। একাধিক সদস্যের খাবার, বাইরে থেকে ওষুধ কেনাসহ নানা খাতে খরচ লাফিয়ে বাড়ছে। অনেক পরিবার দূরদূরান্ত থেকে এসে এই সংকট মোকাবেলা করছেন, আশা করছেন শীঘ্রই সন্তানদের সুস্থ করে বাড়ি ফিরতে পারবেন।



