রাতে ব্রাশ না করার কারণে নিজের অজান্তেই দাঁতের ভয়াবহ ক্ষতি করে চলেছেন অনেকেই। মুখের ভেতরের প্রক্রিয়া ও জীবাণুর কার্যকলাপ বোঝা গেলে এই ক্ষতির মাত্রা স্পষ্ট হয়।
মুখের ভেতর কী ঘটে?
স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মুখের ভেতর লালার নিঃসরণ হয়। সারা দিন কমবেশি চলতে থাকে এ প্রক্রিয়া। খাওয়ার সময় এ নিঃসরণ বাড়ে। কথা বলা কিংবা হাসি-কান্নার সময়ও লালার নিঃসরণ বাড়ে। কিন্তু ঘুমানোর সময় এ নিঃসরণ খুবই কমে যায়। আবার যাঁরা গভীর রাতে জেগে থাকেন, তাঁরাও সে সময় তেমন খাওয়াদাওয়া করেন না। মোটকথা, দিনের চেয়ে রাতে লালা নিঃসৃত হয় কম।
লালা কমে গেলে কী হয়?
লালার নিঃসরণ কমে গেলে কী হয়, তা বোঝার জন্য প্রথমে জেনে নেওয়া যাক মুখের ভেতরকার জীবাণুর বিষয়ে। আমাদের দেহের বিভিন্ন অংশে কিছু জীবাণু থাকে। এসব জীবাণু আমাদের জন্য উপকারী। তবে কিছু পরিস্থিতিতে এসব জীবাণু দিয়েও সংক্রমণ হয়। যখন পর্যাপ্ত লালা নিঃসৃত হয়, তখন মুখের ভেতরকার স্বাভাবিক জীবাণুগুলো সেখানে জমা হতে পারে না। কিন্তু রাতে যখন লালা নিঃসরণ কমে যায়, তখন এসব জীবাণু লম্বা সময়ের জন্য জমা হয় মুখে। এসব জীবাণুর কারণেই তখন ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়। এসব জীবাণুর প্রভাবে দাঁতের ফাঁকে বা গোড়ায় জমে থাকা খাবারের ক্ষুদ্র কণাগুলোয় পচন ধরতে থাকে।
অ্যাসিডের ক্ষতিকর প্রভাব
আরও একটি মারাত্মক বিষয় হলো, এসব জীবাণু অ্যাসিড তৈরি করে এবং সেই অ্যাসিড জমে থাকে মুখে। এ কারণে ক্ষয় হতে থাকে দাঁতের এনামেল। অ্যাসিডের কারণে ঘুম থেকে ওঠার পর মুখে টক ভাবও থাকতে পারে। বাড়ে বিপদের ঝুঁকি। নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করলে মুখের ভেতরটা পরিচ্ছন্ন থাকে।
প্লাক ও অন্যান্য সমস্যা
এত সব প্রাণরাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়ার কারণে দাঁতের ওপর একটা বাড়তি স্তর তৈরি হয়। একে বলা হয় প্লাক। দাঁতের অধিকাংশ সমস্যার জন্যই দায়ী এ প্লাক। দীর্ঘদিন ধরে রাতে ব্রাশ না করার অভ্যাস থাকলে একসময় মুখের দুর্গন্ধ প্রায় স্থায়ী হয়ে যায়। এতে একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস কমে যায়। দাঁতের ফাঁকে বা গোড়ায় জমে থাকা ময়লা একসময় ছোট ছোট সাদাটে পাথরের মতো হয়ে যায়। দাঁতের গোড়া থেকে রক্ত পড়ে। খুব বেশি শক্ত হয়ে গেলে দন্তবিশেষজ্ঞের সাহায্য ছাড়া এগুলো সরানো যায় না। দাঁতের উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়ে যায়। হলদে কিংবা বাদামি দেখায়। অনেকের দাঁতে দাগ পড়ে যায়।
সংবেদনশীলতা ও ক্যাভিটি
দাঁতের এনামেল ক্ষয় হলে ঠান্ডা বা গরম খাবারের প্রতি সংবেদনশীলতা বেড়ে যায়। এ ধরনের কোনো খাবার খেতে গেলে শিরশিরে অনুভূতি হয়। ক্যাভিটির (দাঁতের ক্ষয়) মতো কঠিন সমস্যা দেখা দেয়।
মাড়ির প্রদাহ ও দাঁত পড়া
জীবাণুর সংক্রমণ ও প্রদাহ হয় মাড়িতে। মাড়ি ফুলে যায়, লালচে হয়ে যায়, ব্যথা হয়। মাড়ির গুরুতর প্রদাহ (পেরিওডোন্টাইটিস) দাঁতের আশপাশের হাড়েও ছড়িয়ে পড়তে পারে। দাঁত পড়ে যেতে পারে।
মানসিক ও আর্থিক প্রভাব
দাঁত কিংবা মাড়ির এমন নানা সমস্যায় পছন্দের নানা খাবারের স্বাদ নেওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। তাতে মনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দাঁত ও মাড়ির অবস্থা যত জটিল হয়, চিকিৎসাও হয়ে ওঠে ততটাই ব্যয়বহুল।
সুস্থতার চর্চা
এত সব বিপদ এড়ানোর জন্য সুস্থতার চর্চা করা জরুরি। তবে তা খুব কঠিন কিছু নয়। রোজ দুবার দাঁত ব্রাশ করুন—রাতে ঘুমানোর আগে এবং সকালে নাশতার পর। রাতে ব্রাশ করার পর পানি ছাড়া আর কিছু খাবেন না। প্রতিবার খাবার খাওয়ার পর কুলকুচি করুন। ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করুন।



