বর্ষায় ডেঙ্গু-জন্ডিসের প্রকোপ: কারণ ও প্রতিরোধের উপায়
বর্ষায় ডেঙ্গু-জন্ডিসের প্রকোপ: কারণ ও প্রতিরোধ

তীব্র গরমের পর বর্ষার আগমন স্বস্তি আনলেও এই ঋতু দেশজুড়ে ভাইরাল ইনফেকশনের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতি বছর এই সময়ে হাসপাতালগুলোতে জ্বর, সর্দি-কাশি, গায়ে ব্যথা, পেটের সমস্যা এবং মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এক লাফে অনেক বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রোগব্যাধির প্রক্রিয়া প্রথম ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার আগেই পরিবেশে তৈরি হয়ে যায়।

বর্ষার আগেই বাড়ছে সংক্রমণ

চিকিৎসকদের মতে, বাতাসে বাড়তে থাকা আর্দ্রতা, গরম তাপমাত্রা এবং আবহাওয়ার পরিবর্তন এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যেখানে ভাইরাসগুলো সহজে বেঁচে থাকে এবং দ্রুত ছড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ঋতুভিত্তিক আবহাওয়ার পরিবর্তন শ্বাসকষ্টজনিত, মশাবাহিত এবং পানিবাহিত রোগের বিস্তারকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে।

ভারতের নানাভটি ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের ইনফেকশাস ডিজিজেস অ্যান্ড ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের ডিরেক্টর ড. হর্ষদ লিমায়ে জানান, আবহাওয়া নিজেই ভাইরাস ছড়াতে এবং মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে বড় ভূমিকা পালন করে। তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর বর্ষা পুরোপুরি নামার আগেই বাতাসে আর্দ্রতা বাড়তে থাকে এবং আবহাওয়া গরম থাকে। এই কম্বিনেশনটি নির্দিষ্ট কিছু ভাইরাসকে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে এবং দ্রুত ছড়াতে সাহায্য করে। ফলে ঘরে ঘরে জ্বর, সর্দি, কাশি ও পেটের ইনফেকশন দেখা দেয়।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এর পাশাপাশি মানুষের আচরণগত পরিবর্তনও এর জন্য দায়ী। মেঘলা বা স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার কারণে মানুষ বেশি সময় ঘরের ভেতরে কাটায়। ফলে স্কুল, অফিস, গণপরিবহন বা বাড়ির মতো ভিড় ও বদ্ধ জায়গায় হাঁচি-কাশির মাধ্যমে শ্বাসকষ্টজনিত ভাইরাস (যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা) একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে সহজেই ছড়িয়ে পড়ে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বৃষ্টির সঙ্গে বাড়ছে মশার বংশবিস্তার

বর্ষার বৃষ্টি মশার বংশবিস্তারের জন্য মোক্ষম সুযোগ তৈরি করে। টব, টায়ার, ছাদ, ড্রেন বা যেকোনো খোলা পাত্রে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বাহক ‘এডিস ইজিপ্টি’ মশা ডিম পাড়ে। ন্যাশনাল সেন্টার ফর ভেক্টর বোর্ন ডিজিজেস কন্ট্রোলের তথ্যমতে, কামড়ানোর পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে কয়েক দিন সময় লাগে বলে বৃষ্টির পরপরই হুট করে ডেঙ্গুর গ্রাফ ওপরের দিকে উঠতে শুরু করে।

দূষিত পানি ও জন্ডিসের ঝুঁকি

ভারী বৃষ্টি ও বন্যার ফলে অনেক সময় পয়ঃনিষ্কাশন লাইনের বর্জ্য খাওয়ার পানির সঙ্গে মিশে যায়। এই দূষিত পানি পানের কারণে হেপাটাইটিস এ এবং হেপাটাইটিস ই-এর মতো পানিবাহিত ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে, যা লিভারের ক্ষতি করে এবং প্রাথমিক জ্বর-বমির পর জন্ডিসে রূপ নেয়।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা?

ভাইরাল ইনফেকশন যেকোনো মানুষের হতে পারলেও ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণীর মানুষের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ জ্বরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে। উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিরা হলেন:

  • শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তি
  • গর্ভবতী নারী
  • ডায়াবেটিস, হাঁপানি, হৃদরোগ বা কিডনির সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম যাদের

প্রতিরোধের সহজ উপায়

সচেতনতা ও সাধারণ কিছু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই এই সংক্রমণ থেকে বাঁচা সম্ভব:

  • বাড়ির আশেপাশে কোথাও পানি জমতে দেবেন না এবং পানির পাত্র ঢেকে রাখুন।
  • মশার কামড় থেকে বাঁচতে দিনেও মশারি বা মস্কিউটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করুন।
  • সবসময় ফোটানো বা ফিল্টার করা নিরাপদ পানি পান করুন।
  • বৃষ্টির দিনে রাস্তার খোলা খাবার পরিহার করুন।
  • খাওয়ার আগে ও পরে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন।
  • ঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা রাখুন এবং শিশুর জ্বর হলে স্কুলে পাঠানো থেকে বিরত থাকুন।

কখন যাবেন ডাক্তারের কাছে?

ড. লিমায়ে সতর্ক করে বলেন, ‘যদি জ্বর দুই দিনের বেশি স্থায়ী হয় এবং সেই সঙ্গে শরীরে র্যাশ, তীব্র ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বারবার বমি, প্রস্রাব কমে যাওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা চোখ হলুদ হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তবে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।’ বিশেষ করে ডেঙ্গুর মতো রোগে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় না হলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে।

উল্লেখ্য, বর্ষা যেমন স্বস্তি আনে, তেমনই এটি সতর্ক থাকারও সময়। সামান্য কিছু নিয়ম মেনে চললেই ঋতুপরিবর্তনের এই রোগবালাই থেকে নিজেকে এবং পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।