প্রতিবন্ধী ছেলেকে হত্যা করে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর চেষ্টা, বাবাসহ ৫ জন আসামি
প্রতিবন্ধী ছেলেকে হত্যা করে ফাঁসানোর চেষ্টা, বাবাসহ ৫ আসামি

২০১৭ সালের ২৪ জুন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের হাজীপুর গ্রামে নিহত হন ১৮ বছর বয়সী বাক্, বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী আরিফুল ইসলাম। হত্যার পরদিন তার বাবা আরবেশ আলী বাদী হয়ে ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। অভিযোগ ছিল, গ্রাম্য সংঘর্ষের সুযোগে প্রতিপক্ষের লোকজন আরিফুলকে হত্যা করেছে। থানা-পুলিশ তদন্ত করে ১৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। কিন্তু ঘটনার সাড়ে চার মাস পর আদালত মামলাটি পিবিআইকে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয়।

তিনটি প্রশ্ন যা তদন্তের গতিপথ বদলে দেয়

পিবিআইয়ের মৌলভীবাজারের তৎকালীন পরিদর্শক মুহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম মামলার তদন্তভার পান। নথি পর্যালোচনা করে তিনি তিনটি প্রশ্নের মুখোমুখি হন: প্রথমত, সংঘর্ষে সবচেয়ে গুরুতর আহত আরিফুলকে কেন সবার শেষে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল? দ্বিতীয়ত, ইটপাটকেলের সংঘর্ষে তার শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাত এল কোথা থেকে? তৃতীয়ত, গ্রামের সংঘর্ষে কেন লক্ষ্যবস্তু করা হলো একজন প্রতিবন্ধী তরুণকে?

এই তিন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তদন্তের চিত্র পুরোপুরি উল্টে যায়। নিরপেক্ষ সাক্ষীরা প্রথমে প্রকাশ্যে কিছু বলতে চাননি। পরে নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে গোপনে তাদের জবানবন্দি নেওয়া হলে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। আরিফুল হত্যার নেপথ্যে ছিলেন তার বাবা আরবেশ আলী, চাচা ইয়াকুত মিয়া এবং ইয়াকুতের তিন ছেলে জুনায়েদ আহমদ, বেলাল মিয়া ও তোফায়েল আহমেদ বল্লাদ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পুরোনো হত্যা মামলার প্রতিশোধ নিতে নতুন ষড়যন্ত্র

পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসে, হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টা আগেই বসেছিল একটি গোপন বৈঠক। ঘটনার দিন সকালে পুকুরঘাটে থালাবাসন ধোয়া নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। দুপুরে সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাজীপুর গ্রামের কালাম মিয়ার বাড়িতে বৈঠকে বসেন আরবেশ আলী, তার ভাই ইয়াকুত মিয়া এবং ইয়াকুতের তিন ছেলে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পিবিআই বলছে, আরিফুল হত্যার পেছনে ছিল কয়েক মাস আগের একটি হত্যা মামলার জের। ২০১৭ সালের ১ এপ্রিল দায়ের হওয়া সানজাব হত্যা মামলায় আরিফুলের বাবা আরবেশ আলী এবং তার ভাই ইয়াকুত মিয়ার ছেলে বেলাল মিয়া আসামি ছিলেন। ওই মামলার বাদীপক্ষের লোকজনকে ফাঁসাতেই আরিফুলকে হত্যা করে তাদের বিরুদ্ধে নতুন হত্যা মামলা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী হত্যা

পিবিআইয়ের নথি বলছে, ওইদিন সন্ধ্যায় দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী আরবেশ আলী নিজেই প্রতিবন্ধী ছেলে আরিফুলকে কোলে করে ঘর থেকে বের করে আনেন এবং সিঁড়ির কাছে ফেলে দেন। এরপর ইয়াকুত মিয়া বাঁশের টুকরা দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন। মাথা ফেটে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে যান আরিফুল।

পিবিআইয়ের নথিতে বলা হয়েছে, সে সময় আরিফুল হাত তুলে পানি চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে সাহায্য করার বদলে তার বাবা লাথি মারার চেষ্টা করেন। এতে প্রতিবেশীরা বাধা দিতে এলে তাদের ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়।

হাসপাতালের পথে নয়, নির্জন চা-বাগানে

পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসে, সংঘর্ষে আহত অন্যদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু সবচেয়ে গুরুতর আহত আরিফুলকে হাসপাতালে নেওয়া হয়নি। তাকে প্রথমে কালাম মিয়ার বাড়ির বারান্দায় শুইয়ে রাখা হয়। সেখানেই ইয়াকুত মিয়া তার তিন ছেলেকে নির্দেশ দেন—হাসপাতালে নেওয়ার পথেই আরিফুলকে হত্যা করতে হবে।

এরপর শুরু হয় পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ। ইয়াকুতের ছেলে জুনায়েদ একটি অটোরিকশা নিয়ে আসেন। আর তোফায়েল শ্রীমঙ্গল শহরে গিয়ে ১৪০ টাকা দিয়ে নতুন একটি দা কিনে আনেন। এর কিছুক্ষণ পর আরিফুলকে অটোরিকশায় তোলা হয়। দুই পাশে বসে তাকে ধরে রাখেন জুনায়েদ ও বেলাল। হাসপাতালের দিকে রওনা দিলেও ভৈরবগঞ্জ বাজার পার হয়ে অটোরিকশা ঘুরিয়ে নেওয়া হয় মাজদিহি চা-বাগানের দিকে। রাত নয়টার দিকে চা-বাগানের নির্জন একটি স্থানে আরিফুলকে অটোরিকশা থেকে নামানো হয়।

পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে আরিফুলকে হত্যার পরিকল্পনা থাকলেও একটি গাড়ির আলো দেখা গেলে তাকে আবার অটোরিকশায় তোলা হয়। এরপর গিয়াসনগর এলাকায় পৌঁছানোর পর দা দিয়ে কুপিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। এরপর রাত ১০টার দিকে তাকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

জানাজার পর নীরব থাকার শপথ

তদন্তে আরও উঠে আসে, আরিফুলকে হত্যার পরদিন তার জানাজায় অংশ নেন অভিযুক্তরা। জানাজা শেষে সন্ধ্যায় ইয়াকুত মিয়ার বাড়িতে জড়ো হন জুনায়েদ, বেলাল ও তোফায়েল। সেখানে তারা শপথ করেন, এই হত্যাকাণ্ডের কথা জীবনে কাউকে বলবেন না। ঘটনার বিষয়ে কেউ মুখ খুললে সবার বিপদ হবে বলেও নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন তারা। এর কয়েক দিন পর অটোরিকশাচালক শামসুল হককেও ডেকে সতর্ক করা হয়। তাকে বলা হয়, ঘটনাটি প্রকাশ পেলে তিনিও মামলায় জড়িয়ে পড়বেন। চুপ থাকার বিনিময়ে তাকে দেওয়া হয় তিন হাজার টাকা।

স্বীকারোক্তিতে মিলল তদন্তের সূত্র

নিরপেক্ষ সাক্ষ্য, আলামত এবং অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে প্রথমে ইয়াকুত মিয়াকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। ইয়াকুতের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় জুনায়েদ আহমদ ও তোফায়েল আহমেদ বল্লাদকে। পরে তারা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এ ছাড়া তদন্ত চলাকালে দুই প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী আবদুর রশিদ ও শিরিনা বেগমও আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সিএনজিচালিত অটোরিকশা উদ্ধার করা হয়। এসব তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে পিবিআই নিশ্চিত হয়, আরিফুল হত্যার ঘটনায় প্রতিপক্ষের লোকজন নয়, বরং তার বাবা, চাচা ও স্বজনেরাই জড়িত ছিলেন।

বাদী এবার আসামি

আরিফুল হত্যাকাণ্ডে প্রতিপক্ষ নয়, বরং আরবেশ আলী, ইয়াকুত মিয়া ও তাদের সহযোগীরা জড়িত— পিবিআইয়ের তদন্তে এই তথ্য উঠে আসার পর ২০১৮ সালের ২১ নভেম্বর নতুন মামলা করে পুলিশ। শ্রীমঙ্গল থানার উপপরিদর্শক শাহীন মিয়ার করা এই মামলায় আরবেশ আলী, ইয়াকুত মিয়া, জুনায়েদ আহমদ, বেলাল মিয়া, তোফায়েল আহমেদ বল্লাদ ও অটোরিকশাচালক শামসুল হককে আসামি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, প্রমাণ নষ্ট এবং নিরীহ লোকজনকে ফাঁসানোর অভিযোগ আনা হয়। পরে ২০১৮ সালের ১২ ডিসেম্বর ওই মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়।

পিবিআইয়ের প্রধান ও পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, "তদন্তের শুরুতে যে চিত্র ছিল, শেষ পর্যন্ত সত্য ছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রায় দেড় বছর ধরে চলা তদন্ত শেষে মামলার চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে। যারা শুরুতে বাদী ছিলেন, তারাই এখন আসামি হিসেবে অভিযুক্ত।"

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, "প্রায় সাড়ে সাত বছর আগে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও এখনো বিচারকাজ শেষ হয়নি। মামলাটি এখন সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে আছে।"