যে বয়সে অনেকেই সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার চিন্তায় ব্যস্ত থাকেন, সেই বয়সেই নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণে পরীক্ষার খাতায় কলম ধরেছেন ফুলঝড়ি বেগম। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, তার পাশের পরীক্ষার্থী আর কেউ নন নিজের ছেলে মনিরুল ইসলাম। নাটোরের লালপুরে চলতি বছর একসঙ্গে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন তারা। বিষয়টি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের জন্ম দিয়েছে।
সংগ্রামী জীবন থেকে শিক্ষার আলোয়
লালপুর উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ফুলঝড়ি বেগম ও তার ছেলে দুজনই মোহরকয়া নতুনপাড়া মাধ্যমিক কারিগরি ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী। বর্তমানে তারা উপজেলার মধুবাড়ি দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। ফুলঝড়ি বেগমের জীবনটা ছিল সংগ্রামের। ছোট বয়সেই বিয়ে, তারপর সংসার আর সন্তান লালন-পালনের ব্যস্ততায় পড়াশোনার স্বপ্ন ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায়। তার স্বামী নজরুল ইসলাম কখনো ভ্যান চালিয়ে, কখনো দিনমজুরির কাজ করে সংসার চালান। সীমিত আয়ের সেই সংসারেই সন্তানদের শিক্ষিত করার লড়াই চালিয়ে গেছেন তারা।
মায়ের অনুভূতি
এ বিষয়ে ফুলঝড়ি বেগম বলেন, 'ছোটবেলায় বিয়ে হয়ে যাওয়ায় পড়াশোনা আর করা হয়নি। সংসার সামলাতে সামলাতেই সময় চলে গেছে। কিন্তু মনের মধ্যে সবসময় ইচ্ছে ছিল, একদিন এসএসসি পরীক্ষা দেব। এখন ছেলের সঙ্গে পরীক্ষা দিচ্ছি, এটা গ্রামের অনেকে ভিন্ন চোখে দেখছে, নানা রকম কথা বলছে। তবে এটা আমার জন্য অনেক আনন্দের। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন।'
ছেলের গর্ব
ছেলে মনিরুল ইসলামও মায়ের এই সাহসী সিদ্ধান্তে গর্বিত। তার ভাষায়, 'মায়ের সঙ্গে পরীক্ষা দিতে পেরে আমার খুব ভালো লাগছে। মা আমাদের অনেক কষ্ট করে বড় করেছেন। এখন মাকে পড়াশোনা করতে দেখে আমি আরও উৎসাহ পাই। আমি চাই, মা ভবিষ্যতেও পড়াশোনা চালিয়ে যাক।'
স্বামীর সমর্থন
স্বামী নজরুল ইসলামের কথায় উঠে আসে এক সংগ্রামী পরিবারের দৃঢ়তা। তিনি বলেন, 'একজন শিক্ষিত মা-ই পারে শিক্ষিত জাতি গড়তে। তাই স্ত্রীর পড়াশোনার ইচ্ছায় আমি বাধা দেইনি। ভ্যান চালিয়ে আর দিনমজুরি করে যা আয় করি, তা দিয়েই সংসারের পাশাপাশি তাদের পড়াশোনা চালিয়ে নিচ্ছি। সে যতদূর পড়াশোনা করতে চাই আমার কষ্ট হলেও আমি তাকে পড়াশোনা করাবো।'
প্রশাসনের প্রশংসা
এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনও প্রশংসা জানিয়েছে। লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, 'এটি শুধু লালপুর নয়, পুরো দেশের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ। বয়স কখনো শিক্ষার পথে বাধা হতে পারে না। ইচ্ছাশক্তি থাকলে যে কোনো বয়সেই শিক্ষা অর্জন সম্ভব। তার পড়াশোনার প্রয়োজনে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা হবে।'



